শান্তিগঞ্জে দিনভর গ্রামীণ ঐতিহ্যের কুস্তি খেলা, মাঠে হাজারো দর্শকের ঢল
শান্তিগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী কুস্তি খেলা। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) উপজেলার শিমুলবাঁক ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া কামলাবাজ গ্রামের মাঠে স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্যোগে এ দাওয়াতি (প্রীতি) কুস্তি খেলার আয়োজন করা হয়।
ঐতিহ্যবাহী এ খেলাকে ঘিরে সকাল থেকেই এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে শান্তিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজারো দর্শক মাঠে এসে কুস্তি খেলা উপভোগ করেন।
আয়োজক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের খেলায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালিয়া কামলাবাজ গ্রামের কুস্তিগীরদের মুখোমুখি হন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার টুকেরগাঁও গ্রামের কুস্তিগীরেরা। দুই গ্রামের কুস্তিগীরদের লড়াই দেখতে মাঠজুড়ে ছিল দর্শকদের উপচেপড়া ভিড়।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতাটি কয়েকটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে ছিল ‘ফনার খেলা’, দ্বিতীয় ধাপে ‘সানি দাগা’ এবং চূড়ান্ত পর্বে অনুষ্ঠিত হয় ‘দাগাদের’ আকর্ষণীয় কুস্তি। প্রতিটি ধাপেই কুস্তিগীরদের শক্তি, কৌশল ও নৈপুণ্য দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ খেলা বিকেল ৫টার দিকে সমতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
কুস্তিগীরদের আতিথেয়তায় উৎসবের আবহ
কুস্তি খেলা শুধু মাঠের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; খেলোয়াড়দের আপ্যায়ন ঘিরেও ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনন্য আয়োজন। খেলা শেষে আমন্ত্রিত কুস্তিগীরদের—স্থানীয় ভাষায় যাদের ‘মাল’ বলা হয়—গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে নিয়ে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করা হয়। তাদের সঙ্গে থাকা লোকজন ও অতিথি দর্শকদেরও বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়।
আয়োজকরা জানান, কুস্তিগীরদের আতিথেয়তার জন্য গ্রামের সম্মিলিত অর্থায়নে গরু জবাই করা হয়। পাশাপাশি ‘নাইওরী’দেরও গ্রামের ঘরে ঘরে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ফলে পুরো গ্রামজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। খেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজক, কুস্তিগীর, দর্শক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনও আরও দৃঢ় হয়।
ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান
খেলা পরিচালনা কমিটিতে ছিলেন কাঁঠালিয়া কামলাবাজ গ্রামের সৌদি প্রবাসী রাসেল মিয়া ও গ্রামের সাবেক কুস্তিগীর জাবেদ মাল। খেলায় ‘আমিনাতি’ (বিচারক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চাঁনবাড়ী গ্রামের নেচার আলম, খেশবপুরের মতিয়া ও জগাইরগাঁওয়ের জাহিদ আহমদ।
আয়োজক ও স্থানীয়রা বলেন, একসময় গ্রামবাংলার বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল কুস্তি খেলা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের বিস্তারের ফলে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এ খেলাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। নিয়মিতভাবে এমন আয়োজন করা হলে নতুন প্রজন্ম গ্রামীণ সংস্কৃতি ও চিরায়ত ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
তারা আরও বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে কুস্তিসহ হারিয়ে যেতে বসা বিভিন্ন লোকজ খেলাধুলা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ঐতিহ্য রক্ষায় পাশে থাকার আশ্বাস ইউএনওর
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল চাকমা বলেন, “আমি এই এলাকায় খেলাটির ব্যাপারে প্রথম শুনলাম। ভালো লাগছে একটি গ্রামীণ ঐতিহ্যের চর্চা আমার উপজেলায় হচ্ছে। আমি যদি এই খেলাকে রক্ষা করতে কিছুটা ভূমিকা পালন করতে পারি তাহলে অবশ্যই আমার ভালো লাগবে।”
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএনও হিল্লোল চাকমা বলেন, “যারা কুস্তি খেলার আয়োজন করেন তারা যদি কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে তাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা কুস্তি খেলার উন্নয়নে কাজ করবো।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করা হলে একদিকে যেমন গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী কুস্তি খেলা টিকে থাকবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি ও খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।