logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
সিলেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

সিসিকের বর্জ্যে ভরাট ভাড়েরা বিল, হুমকিতে কৃষি-মৎস্য ও জনস্বাস্থ্য

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন সিলেট
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন
সিসিকের বর্জ্যে ভরাট ভাড়েরা বিল, হুমকিতে কৃষি-মৎস্য ও জনস্বাস্থ্য

সিলেট : কয়েক বছর আগেও যেখানে ছিল বিস্তীর্ণ জলরাশি, মাছের বিচরণ আর কৃষকের ধান চাষ—সেই ভাড়েরা বিল এখন পরিণত হয়েছে বর্জ্যের স্তূপে। পানির অস্তিত্ব সামান্য থাকলেও তা কালো ও দূষিত। বিলের পানিতে নেই মাছ বা কোনো জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব। বর্জ্যের কারণে বিল ও আশপাশের হাওর ভরাট হয়ে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।


সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পারাইচক এলাকায় অবস্থিত সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্জ্য ডাম্পিং গ্রাউন্ডের পাশেই ভাড়েরা বিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বিল ও হাওরে। এতে একসময়কার সমৃদ্ধ জলাভূমি ক্রমে ভরাট হয়ে গেছে।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভাড়েরা বিল ও আশপাশের হাওরগুলো ছিল অন্তত ১০টি এলাকার মানুষের ধান, মাছ ও পানির অন্যতম উৎস। বর্তমানে এসব জলাশয়ের বড় অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ ও মাছ উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি পানি ব্যবহারেরও উপযোগী নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।


ভাড়েরা বিল রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন গঙ্গারামের চক গ্রামের সমাজকর্মী শামীম কবির। তিনি অভিযোগ করেন, সিসিকের বর্জ্যের কারণে ভাড়েরা বিলসহ আশপাশের পাঁচ-ছয়টি হাওর প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ২০ একর আয়তনের বিলটির মধ্যে ১৫ একরই ভরাট হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। অবশিষ্ট অংশে সামান্য পানি থাকলেও সেটি কুচকুচে কালো এবং সেখানে মাছ বা ধান চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।


শামীম কবির বলেন, বিল ও হাওর রক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে মন্ত্রী, মেয়র ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।


স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাড়েরা বিলের চারপাশে অন্তত পাঁচটি মৎস্যজীবী গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের জীবিকা একসময় মাছ চাষ ও আহরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিলের পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।


ছিটা গোটাটিকর এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রায় এক দশক আগেও এই বিল থেকে বছরে কয়েক টন মাছ উৎপাদন হতো। বিল ও আশপাশের এলাকায় প্রায় দুই হাজার একর জমিতে ধান চাষ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ধান-মাছ কোনোটিই নেই। বর্ষাকালেও বর্জ্যের কারণে অনেক জায়গা শুকনো থাকে এবং বিলের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায়।


কুচাই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সবুজ কুমার বিশ্বাস বলেন, কয়েক বছর আগেও ভাড়েরা বিল পাখ-পাখালির কলকাকলিতে মুখর থাকত। প্রতিবছর সেখানে পলো বাওয়া উৎসব হতো। কৃষকেরা বিলের পানি ব্যবহার করে ধান চাষ করতেন এবং মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতেন। এখন সেই বিলের অস্তিত্বই প্রায় হারিয়ে গেছে।


তিনি বিলটি পুনঃখনন, পাড় বাঁধাই, তালগাছ রোপণ এবং পরিবেশবান্ধবভাবে জলাভূমিটি পুনরুদ্ধারের দাবি জানান।


স্থানীয় সূত্র বলছে, ভাড়েরা বিল ভরাট ও দূষণের কারণে আলমপুর, মনিপুর, ছিটা গোটাটিকর, গঙ্গারামের চক, গোটাটিকর, হবিনন্দী, গঙ্গানগর, পালপুর, কুচাই ও শ্রীরামপুরসহ অন্তত ১০ এলাকার মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।


বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ, দাবি সিসিকের


সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ লাখ মানুষের নগরীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে দক্ষিণ সুরমার পারাইচক ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নেওয়া হয়।


বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ (এমআরএফ) প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া প্ল্যান্টটিতে বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথকীকরণের কাজ হচ্ছে। পৃথক করা প্লাস্টিক ও পলিথিন পুনর্ব্যবহার এবং বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পৃথকীকরণের পরও বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে স্তূপাকারে জমা হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য ও দূষিত পানি আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।


পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেটের সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, সিটি করপোরেশনের যেখানে হাওর ও বিল রক্ষায় ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এসব জলাভূমি ধ্বংস হচ্ছে। এতে ধান ও মাছের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


‘এখন আর বর্জ্য বাইরে যায় না’: সিসিক


অভিযোগের বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবেদীন বলেন, আগে ডাম্পিং স্টেশনের বর্জ্য আশপাশের হাওর ও বিলে ছড়িয়ে পড়ত। বর্তমানে ডাম্পিং ইয়ার্ডের চারপাশে সীমানা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বর্ষাকালে পানির সঙ্গে দেয়াল উপচে কিছু বর্জ্য বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।


তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে এবং প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে। লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ প্ল্যান্টটির কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।


সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও দাবি করেন, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের ফলে বর্তমানে ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে বর্জ্য বাইরে যাচ্ছে না।


তিনি জানান, সিলেটে দেশের প্রথম ‘বায়োড্রায়িং প্ল্যান্ট’ স্থাপনের কাজ চলছে। প্ল্যান্টটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।


এদিকে সম্প্রতি সিলেট নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে এসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ সুরমা হোলসিমের যৌথ প্রকল্পটি ২০২৪ সালে চালু হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। এখন থেকে এটি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক আলাদা করে লাফার্জ সুরমা তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবে এবং অবশিষ্ট বর্জ্য সিটি করপোরেশন জৈব সারে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে।


তবে স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনার পাশাপাশি ইতোমধ্যে বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভাড়েরা বিল ও আশপাশের জলাভূমি পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জলাভূমি পুনরুদ্ধার করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/17539
Page of