জীবিকার পথে যাত্রা, ফিরল লাশ হয়ে: দাউদকান্দি ট্রাক দুর্ঘটনায় নিহত ৭
অনলাইন ডেস্ক। :
কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহতের ঘটনায় দিনাজপুরের বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার একাধিক গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। জীবিকার তাগিদে ঘর ছেড়ে বের হওয়া মানুষগুলো আর ফিরে না আসায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোররাত প্রায় ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুর এলাকায় চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ট্রাকের ওপর থাকা ১৩ জনের মধ্যে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন এবং আহত হন আরও ছয়জন।
নিহতরা হলেন—দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর এলাকার মো. আজাদের ছেলে আফজাল হোসেন (৩৫), একই এলাকার আলমের ছেলে সোহরাব হোসেন (৪০), ফজলুর রহমানের ছেলে সালেক (৪৫); বিরামপুর উপজেলার ভাইগড় গ্রামের পলাশ হোসেনের ছেলে সুমন বাবু (২২), সইফ উদ্দিনের ছেলে বিষু (৪৫), বীর মুক্তিযোদ্ধা মজির উদ্দিনের ছেলে আবু হোসেন (৪২) এবং রফিতুল্লাহ মন্ডলের ছেলে আব্দুর রশিদ (৬৫)।
সরেজমিনে বিরামপুর উপজেলার ভাইগড় গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একই গ্রামের একাধিক পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারানোর বেদনায় পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ নির্বাক হয়ে বসে আছেন—আবার কেউ বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা এই গ্রামে আগে কখনো ঘটেনি।
নিহত বিষুর পরিবারে রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেটি দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে, সামনে এসএসসি পরীক্ষা। ছোট মেয়েটি এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায়।
অন্যদিকে আব্দুর রশিদ রেখে গেছেন বৃদ্ধ স্ত্রী লাইলী বেগমকে। ছয় মেয়ের সবাই বিয়ে হয়ে গেলেও বার্ধক্যে স্ত্রীর একমাত্র ভরসা ছিলেন তিনি। স্বজনদের কান্নাজড়িত প্রশ্ন—“এখন তাকে দেখবে কে?”
আবু হোসেন রেখে গেছেন দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে। আর সুমন বাবু—যিনি এখনো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারেননি—সংসারের অভাব দূর করতে দূরপাল্লার পথে পাড়ি দিয়ে আর ফিরে এলেন না।
নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর এলাকাতেও একই শোকের চিত্র। একই গ্রামের তিনজনের মৃত্যুতে সেখানে চলছে শোকের মাতম। স্বজন হারানোর বেদনায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন পরিবার-পরিজনরা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে ছুটে যাচ্ছেন। নিহতদের লাশ দ্রুত নিজ নিজ এলাকায় এনে দাফন সম্পন্নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শুধু সাতটি প্রাণই ঝরে যায়নি—একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে একাধিক পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।