হালাল রিজিক ও সম্পদে বরকত লাভে যে ১০টি আমলের কথা বলেছে কোরআন-হাদিস
ইসলামে সম্পদশালী হওয়া নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল উপায়ে উপার্জন, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে শুধু কিছু আমল বা দোয়া করলেই প্রত্যেক ব্যক্তি ধনী হয়ে যাবেন—বিষয়টি এমন নয়। বরং কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু আমলের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেগুলো মানুষের জীবনে রিজিকের প্রশস্ততা, বরকত ও মানসিক প্রশান্তি লাভের পথ তৈরি করে।
হালাল পথে উপার্জনের জন্য কাজের দক্ষতা অর্জন, পরিশ্রম ও সততার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী কোরআন-হাদিসের আলোকে রিজিকে বরকত লাভের ১০টি আমলের কথা তুলে ধরেছেন।
নিচে তাঁর আলোচনার মূল বিষয়গুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
১. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা মুমিনের সফলতার অন্যতম মাধ্যম। মানুষের জীবনে যত নিয়ামত রয়েছে, সেগুলোর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। অভাব-অনটনের মধ্যেও যা পাওয়া গেছে, তার জন্য সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের (নেয়ামত) বাড়িয়ে দেবো। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয়ই আমার আজাব বড় কঠিন।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)
২. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা
ইস্তেগফার অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। নিয়মিত ইস্তেগফার করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, তিনি তো ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদীনালা।’ (সুরা নুহ: ১০-১২)
সুনানে আবু দাউদের ১৫১৮ নম্বর হাদিসেও ইস্তেগফারের মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণ ও অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিজিক লাভের কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদিসটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; আলবানী (রহ.) এটিকে দুর্বল বলেছেন।
৩. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা
তাওয়াক্কুল অর্থ আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। তবে এর অর্থ কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকা নয়; বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে চেষ্টা করার পাশাপাশি ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা।
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের সেভাবে রিজিক দিতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দিয়ে থাকেন। পাখিরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে।’ (জামে তিরমিজি: ২৩৪৪)
৪. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা
আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করা রিজিকে বরকত লাভের অন্যতম উপায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। আর তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আত-তালাক: ২-৩)
৫. আল্লাহর ইবাদতে গাফিলতি না করা
নিয়মিত নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াতসহ অন্যান্য ইবাদত পালনে যত্নবান হওয়া প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং জীবনে বরকত কামনা করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে আহলে কিতাবের প্রসঙ্গে বলেন, তারা যদি তাওরাত, ইঞ্জিল এবং তাদের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বিধানের ওপর যথাযথভাবে আমল করত, তাহলে তাদের ওপর ও নিচ থেকে প্রাচুর্য নেমে আসত। (সুরা আল-মায়িদা: ৬৬)
৬. আন্তরিকভাবে তাওবা করা
তাওবা অর্থ নিজের পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, পাপের কাজ পরিত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
হজরত হুদ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ‘হে আমার জাতি! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁর দিকে ফিরে আসো। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন।’ (সুরা হুদ: ৫২)
৭. কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ প্রদান করা
কর্জে হাসানা অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অভাবী ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে উত্তমভাবে ঋণ দেওয়া। কাউকে সাহায্য করা এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করে, তাদের দেওয়া হবে বহুগুণ বেশি এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা আল-হাদিদ: ১৮)
৮. আল্লাহর পথে ব্যয় করা
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরিব-দুঃখী, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সৎ কাজে সম্পদ ব্যয় করা মুমিনের অন্যতম গুণ। দান-সদকা সম্পদ কমিয়ে দেয় না; বরং আল্লাহর কাছে এর উত্তম প্রতিদানের আশা করা যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলে দাও, আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করে দেন। তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার প্রতিদান দেবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ (সুরা সাবা: ৩৯)
৯. বিয়ে করা
ইসলামে বিয়েকে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিয়ের মাধ্যমে মানুষ পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করে এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপন শুরু করে। অভাবের কারণে বিয়ে থেকে পিছিয়ে না থাকার উৎসাহও কোরআনে রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে সম্পন্ন করো এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আন-নুর: ৩২)
১০. রিজিক ও খাদ্যের জন্য দোয়া করা
রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। পবিত্র কোরআনে হজরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) আল্লাহর কাছে আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করার আবেদন করেছিলেন।
দোয়াটি হলো—
**رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنْكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ**
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্য অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সবার জন্য আনন্দের বিষয় হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের রিজিক দান করুন। আপনিই তো সর্বোত্তম রিজিকদাতা।’ (সুরা আল-মায়িদা: ১১৪)
পরিশেষে
হালাল উপার্জন, সততা, পরিশ্রম, আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, ইস্তেগফার, তাওবা, তাকওয়া ও দান-সদকা একজন মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই শুধু সম্পদশালী হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকত লাভের আশায় এসব আমল করা উচিত।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল পথে উপার্জন করার তাওফিক দান করুন, রিজিকে বরকত দিন এবং অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দান করুন। আমিন।
লেখক:** হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।