logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
ধর্ম ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০৬ অপরাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

ঈমান রক্ষায় গুহায় আশ্রয়, ৩০৯ বছরের বিস্ময়কর ঘটনা আসহাবে কাহাফের

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০৬ অপরাহ্ন ধর্ম
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০৬ অপরাহ্ন
ঈমান রক্ষায় গুহায় আশ্রয়, ৩০৯ বছরের বিস্ময়কর ঘটনা আসহাবে কাহাফের

ইসলামি ফিচার | হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী


পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসী যুবকদের ঘটনা ঈমান, তাওহিদ, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিকূল পরিবেশেও ঈমান রক্ষায় তাঁরা যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মুসলিম উম্মাহর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সূরা আল-কাহাফের ৯ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে তাঁদের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাফসিরের বিভিন্ন গ্রন্থেও এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।


মূর্তিপূজার সমাজে ঈমানের আলো


ইসলামপূর্ব এক যুগে একদল যুবক এমন সমাজে বসবাস করতেন, যেখানে মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তির উপাসনায় লিপ্ত ছিল। কিন্তু ওই যুবকেরা মানুষের তৈরি মূর্তিকে উপাস্য হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের বিবেক প্রশ্ন তুলেছিল—যে বস্তু মানুষ নিজ হাতে তৈরি করে, তা কীভাবে মানুষের উপাস্য হতে পারে?


মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাঁদের ঈমানের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাঁরা ছিলেন এমন একদল যুবক, যাঁরা তাঁদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁদের হিদায়াত আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।


যুবকেরা উপলব্ধি করেছিলেন, আকাশ-জমিনের সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ। তাঁর কোনো শরিক নেই। তাই তাঁরা মূর্তিপূজা ও শিরক থেকে নিজেদের দূরে রাখেন এবং এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করেন।


ঈমানের কারণে শাসকের রোষানলে


যুবকদের ঈমান ও আদর্শের কথা তৎকালীন শাসকের কানে পৌঁছালে তিনি ক্ষুব্ধ হন। তাফসিরভিত্তিক বর্ণনা অনুযায়ী, শাসক তাঁদের নিজের ধর্মে ফিরে আসার নির্দেশ দেন এবং অন্যথায় কঠোর শাস্তির হুমকি দেন।


কিন্তু যুবকেরা সত্যের পথ থেকে সরে আসেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ। মানুষের ভয় কিংবা পার্থিব ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁরা নিজেদের ঈমান বিসর্জন দিতে রাজি ছিলেন না।


পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠলে তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সিদ্ধান্ত নেন, এমন একটি নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেবেন, যেখানে নির্বিঘ্নে আল্লাহর ইবাদত করা সম্ভব হবে।


গুহায় আশ্রয় ও আল্লাহর রহমত


ঈমান রক্ষার উদ্দেশ্যে যুবকেরা নিজেদের আবাসভূমি ছেড়ে একটি গুহায় আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁরা মহান আল্লাহর কাছে রহমত ও সঠিক পথের দিশা প্রার্থনা করেন।


পবিত্র কোরআনে তাঁদের সেই প্রার্থনার মর্ম তুলে ধরা হয়েছে—হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে দিন।


আল্লাহ তাঁদের ঘুমের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য আচ্ছন্ন করে রাখেন। সূরা আল-কাহাফে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা গুহায় বহু বছর অবস্থান করেন। পরে আল্লাহ তাঁদের জাগিয়ে তোলেন, যাতে তাঁদের অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে মানুষের সামনে এক বিস্ময়কর নিদর্শন প্রকাশিত হয়।


শতাব্দী পেরিয়ে জেগে ওঠা


দীর্ঘ নিদ্রার পর যুবকেরা যখন জেগে ওঠেন, তখন তাঁদের মনে হয়েছিল, হয়তো এক দিন কিংবা দিনের কিছু অংশ তাঁরা ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। তাঁদের প্রকৃত অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না।


তাঁদের একজনকে খাবার সংগ্রহের জন্য শহরে পাঠানো হয়। তাঁকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল, যেন কারও কাছে তাঁদের অবস্থান প্রকাশ না পায়। তিনি পুরোনো মুদ্রা নিয়ে শহরে প্রবেশ করে খাবার কেনার চেষ্টা করেন।


তাফসিরভিত্তিক বর্ণনায় রয়েছে, তাঁর ব্যবহৃত মুদ্রা দেখে লোকজন বিস্মিত হয়ে পড়ে। কারণ মুদ্রাটি ছিল বহু পুরোনো সময়ের। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে ধীরে ধীরে তাঁদের পরিচয় প্রকাশিত হয়। মানুষ জানতে পারে, এই যুবকেরা বহু শতাব্দী আগে ঈমান রক্ষার জন্য গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।


পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় তাঁদের গুহায় অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে ৩০০ বছর এবং অতিরিক্ত নয় বছরের উল্লেখ রয়েছে। তবে এ ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য কেবল সময়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, পুনরুত্থানের সত্যতা এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।


আসহাবে কাহাফের ঘটনা থেকে শিক্ষা


আসহাবে কাহাফের ঘটনা মুসলমানদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে।


প্রথমত, সত্য ও ঈমানের পথে অবিচল থাকার জন্য সাহস ও দৃঢ়তা প্রয়োজন। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস হারানো উচিত নয়।


দ্বিতীয়ত, মানুষের সংখ্যা কিংবা পার্থিব ক্ষমতা সত্যের মানদণ্ড নয়। সত্যকে চিনতে হবে আল্লাহর নির্দেশনা ও সঠিক জ্ঞানের আলোকে।


তৃতীয়ত, বিপদ-আপদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখতে হবে। আসহাবে কাহাফের যুবকেরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করেছিলেন।


চতুর্থত, আল্লাহর ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা মানুষের সীমিত জ্ঞানের ঊর্ধ্বে। জীবন, মৃত্যু, ঘুম, জাগরণ এবং সময়ের ওপর তাঁরই পূর্ণ কর্তৃত্ব।


সবশেষে বলা যায়, আসহাবে কাহাফের ঘটনা শুধু অতীতের একটি বিস্ময়কর ঘটনা নয়; এটি ঈমানদার মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। সত্যের পথে অবিচল থাকা, শিরক থেকে দূরে থাকা, আল্লাহর ওপর নির্ভর করা এবং প্রতিকূল অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করাই এ ঘটনা থেকে পাওয়া অন্যতম প্রধান শিক্ষা।


লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক, তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা, সিলেট।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/18302
Page of