যাঁকে ভালোবাসা ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী:
ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা। একজন মুমিনের যেসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া জরুরি, তার অন্যতম হলো নবীজির প্রতি গভীর ভালোবাসা। হাদিস শরিফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
অর্থাৎ, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে তার বাবা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই।’ —সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। এই মানদণ্ডে প্রত্যেকে নিজের ঈমানের অবস্থা যাচাই করতে পারেন। অন্তরে যদি তাঁর প্রতি গভীর মহব্বত ও ভালোবাসা অনুভব করেন, তাহলে আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি সেই ভালোবাসাকে সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করতে হবে। আর যদি সেই ভালোবাসায় ঘাটতি থাকে, তাহলে আত্মসংশোধনের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
মুমিন কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালো না বেসে পারে? যাঁর মাধ্যমে মানবজাতি ঈমান ও কুরআনের মতো মহাসম্পদের সন্ধান পেয়েছে, লাভ করেছে মুমিন হওয়ার সৌভাগ্য; যিনি ইহকাল ও পরকালের শান্তির পথ দেখিয়েছেন; সেই পথ দেখাতে গিয়ে যাঁর রক্ত ঝরেছে, দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছে, এরপরও যিনি উম্মতের নাজাত ও হেদায়েতের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন—তাঁকে তো ভালোবাসতেই হবে।
তিনি মানুষকে দিয়েছেন মনুষ্যত্বের শিক্ষা। মাটির মানুষকে পরিচিত করেছেন তার আসমানি মর্যাদার সঙ্গে। মানুষের সামনে উন্মুক্ত করেছেন বিশ্বাস ও কর্মের এক উন্নত জগৎ। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বাস, চেতনা, চরিত্র ও নৈতিকতার উচ্চতায় আরোহণের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন। এক কথায়, তিনি মানুষকে দেখিয়েছেন তার মানবজন্ম সার্থক করার পথ। তাঁকে ভালোবাসা ছাড়া এবং তাঁর অপরিশোধ্য ঋণ স্বীকার করা ছাড়া আমরা সভ্য মানুষ কীভাবে হব?
ঈমান মানুষকে সভ্য-সুশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। ঈমান এমন সব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে বলে, যা ছাড়া কেউ সত্যিকার অর্থে সজ্জন ও সর্বাঙ্গসুন্দর হতে পারে না। এ কারণেই ঈমানের শিক্ষা বিস্তারের আজ অত্যন্ত প্রয়োজন।
ঈমানের শিক্ষায় মানুষ পরিশুদ্ধ ও পরিশীলিত হয়। তার চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, উদ্যম-উদ্দীপনা সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তার যোগ্যতা ও সক্ষমতা তাকে সঠিক গন্তব্যের দিকে পরিচালিত করে।
মানুষের আবেগ-অনুভূতিও তার একটি শক্তি। এই শক্তি সঠিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে এর মাধ্যমে অসাধ্যও সাধন হতে পারে। অন্যদিকে ভুল ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ সমাজকে অবক্ষয় ও অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইসলামের শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষের আবেগ-অনুভূতির সঠিক ক্ষেত্র নির্দেশ করা। কোথায় ভালোবাসার শক্তি ব্যবহার হবে এবং কোথায় বিরাগ বা বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকতে হবে—কুরআন-সুন্নাহয় তার দিকনির্দেশনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে এসেছে—
«مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ، وَأَبْغَضَ لِلَّهِ، وَأَعْطَى لِلَّهِ، وَمَنَعَ لِلَّهِ، فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ»
অর্থাৎ, ‘যে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য বিদ্বেষ পোষণ করে, আল্লাহর জন্য দেয় এবং আল্লাহর জন্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে, সে তার ঈমান পূর্ণ করেছে।’ —সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৬৮১।
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, কর্মের ক্ষেত্রে যেমন মুমিনের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ নেই, তেমনি আবেগ-অনুভূতি, অনুরাগ-বিরাগের ক্ষেত্রেও নেই। মুমিনের ভালোবাসা হবে আল্লাহর জন্য এবং বিরাগও হবে আল্লাহর জন্য। তখন ভালোবাসা ও বিরাগের মতো মানবীয় প্রবৃত্তিও ঈমানের পূর্ণতার উপায় হয়ে ওঠে।
চিন্তাশীল যে কেউ শান্তভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবলে ইসলামের এই শিক্ষার যথার্থতা উপলব্ধি করতে পারবেন। আজকের মানবসমাজের অবক্ষয় ও অনৈতিকতার একটি বড় অংশ কি মানুষের অনুরাগের বিপথগামিতার ফল নয়? তেমনি সমাজের হানাহানি, জুলুম ও অবিচারেরও একটি বড় অংশ কি অসংযত বিদ্বেষের কুফল নয়?
কাজেই মানবস্বভাবের এই দুই প্রবৃত্তিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। স্বেচ্ছাচারিতার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সঠিক ও যথার্থ ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইসলাম মানুষকে সেই শিক্ষাই দেয়।
আল্লাহর জন্য যে ভালোবাসা, তার মধ্যে পবিত্রতম ও গভীরতম ভালোবাসা হলো তাঁর রাসূল, খাতামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা। মানবের প্রতি মানবের এর চেয়ে পবিত্র ও যথার্থ ভালোবাসা আর হতে পারে না।
তিনি মুমিনের কাছে তার বাবার চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা ও সম্মানের, নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি প্রিয় এবং জগতের সকল পছন্দের মানুষের চেয়েও বেশি প্রিয়। মুমিন-হৃদয়ের এই নির্মল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতার প্রকাশ ঘটবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে—চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, কর্ম, প্রেরণা, উদ্যম ও উদ্দীপনায়।
এই পবিত্র ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন, সাধনা, দ্বীন ও শরিয়তের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন, সমর্পণ ও ভালোবাসার মাধ্যমে। সুন্নাহ ও শরিয়তের পঠন-পাঠন, অনুসরণ-অনুশীলন, বিস্তার ও সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই মুমিন নিজেকে অগ্রণী করার চেষ্টা করবে। আর তা করবে হৃদয়ের গভীরে থাকা সেই পবিত্র ভালোবাসা থেকে।
কে না বুঝবে, দ্বীন ও শরিয়তের অনুসরণের মধ্য দিয়েই আমরা সুন্দর জীবন ও কল্যাণময় সমাজ গড়ে তুলতে পারি? তাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা জীবন গঠন ও সমাজ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সুস্থ-সুন্দর জীবন গঠন এবং শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
তাই আসুন, আমরা আমাদের ঈমানকে মজবুত করি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের জীবন ও জগৎকে আলোকিত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট; সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট; সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট; সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।