কঠোর সময়সীমায় বড় প্রকল্প: ২৮০ নির্বাচনী এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ
ঢাকা |
দেশের গ্রামীণ জনপদের সার্বিক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বড় পরিসরের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের ২৮০টি নির্বাচনী এলাকায় (সিটি কর্পোরেশন এলাকা ব্যতীত) বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপকে গ্রামীণ উন্নয়নে একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (কাবিখা-১) লাবনী চাকমা স্বাক্ষরিত ০৯ এপ্রিল তারিখের এক সরকারি আদেশে এ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে প্রদান করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ অনুলিপি চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় মূলত গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট, ছোট অবকাঠামো এবং বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও জরাজীর্ণ অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও সহজ ও নিরাপদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এই বরাদ্দ তিনটি প্রধান খাতে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭০ কোটি টাকা নগদ অর্থ, ৫,৬০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫,৬০০ মেট্রিক টন গম। নগদ অর্থের পাশাপাশি খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার দিকটিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ মে ২০২৬-এর মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই সময়সীমা বাড়ানো হবে না বলে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
এছাড়া বরাদ্দ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (PIC) গঠন করে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়ের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবারের নির্দেশনায় বেশ কিছু নতুন ও কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা অতীতের তুলনায় নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কাজ শুরুর আগেই প্রকল্প এলাকার বাস্তব অবস্থা পরিমাপ করে তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে কাজ শেষে তার সঙ্গে তুলনা করে অগ্রগতি ও মান যাচাই করা যায়। এই ‘প্রি-ওয়ার্ক ডকুমেন্টেশন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিটি প্রকল্প এলাকায় বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পারে। এতে করে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরেজমিনে পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা যাচাইয়ের পরই কেবল বরাদ্দকৃত অর্থ বা খাদ্যশস্য ছাড় করা হবে। এতে করে অপ্রয়োজনীয় বা কাগুজে প্রকল্প কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে কিংবা কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি এবং অগ্রগতি প্রতিবেদন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের গ্রামীণ অবকাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, সংস্কারকৃত সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়ে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, কঠোর সময়সীমা, স্বচ্ছতা নিশ্চিতের নতুন বিধান এবং জবাবদিহিতার কড়াকড়ি—এই তিনের সমন্বয়ে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা দেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।