টিকটকে পরিচয়, স্বাধীন জীবনের স্বপ্নে ঘরছাড়া কুমিল্লার ৪ স্কুলছাত্রী, উদ্ধার হবিগঞ্জে
কুমিল্লা : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে পরিচিত তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখেছিল কুমিল্লার চার স্কুলছাত্রী। স্বাধীনভাবে বাঁচা ও নিজেরা উপার্জন করার পরিকল্পনায় পরিবারের কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছাড়ে তারা। পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন বিক্রি করে পাওয়া টাকা নিয়ে প্রথমে ঢাকায় যায়, পরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে পৌঁছায়। নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের অনুসন্ধানে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ অক্টোবর সকালে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় চার ছাত্রী। তবে তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়নি। বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে পুলিশকে জানানো হয়। পরে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ তাদের উদ্ধারে অনুসন্ধান শুরু করে।
নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি তাদের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দেশের বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। একপর্যায়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানা পুলিশের সহায়তায় ১২ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে তাদের উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিক্ষার্থীরা জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ও টিকটকে ভিডিও প্রকাশের সূত্র ধরে কয়েকজন অপরিচিত তরুণের সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে ওঠে। ওই তরুণদের প্রকৃত নাম-ঠিকানা সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এরপরও তাদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও উপার্জনের স্বপ্ন দেখেছিল তারা।
পুলিশ জানায়, বাড়ি ছাড়ার সময় পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার সঙ্গে নেয় শিক্ষার্থীরা। পরে কুমিল্লার টাউন হল সুপার মার্কেট এলাকায় মোবাইল ফোনটি চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। সেই টাকা নিয়ে প্রথমে ঢাকায় যায় তারা।
তবে ঢাকায় নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে এক শিক্ষার্থীর দাদাবাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে সেখানে পৌঁছালেও নির্দিষ্ট ঠিকানা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ে তারা।
চুনারুঘাটে পৌঁছে অন্ধকারে ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বিভিন্ন স্থানে ঘুরছিল চার শিক্ষার্থী। তাদের পরিস্থিতি ও আচরণ দেখে চালকের সন্দেহ হয়। পরে তিনি পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বুধবার (১৪ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিখোঁজ চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধারের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীদের পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, অনলাইন পরিচয়ের সূত্র ধরে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ছাড়ার ঘটনায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চার স্কুলছাত্রীর এ ঘটনা শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অল্প বয়সে ভার্চুয়াল জগতের পরিচয়কে বাস্তব জীবনের নিরাপদ সম্পর্ক মনে করে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এ ঘটনা তারই একটি সতর্কবার্তা।
শিশুদের অনলাইন কার্যক্রমে অভিভাবকদের সচেতন নজরদারি, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং পরিবারের মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখার গুরুত্বও এ ঘটনা সামনে এনেছে।