logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
সিলেট ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:০১ অপরাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

বিয়ানীবাজারে বালু উত্তোলন নিয়ে উত্তেজনা, অবরুদ্ধ ৬ জনকে উদ্ধার

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:০১ অপরাহ্ন সিলেট
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:০১ অপরাহ্ন
বিয়ানীবাজারে বালু উত্তোলন নিয়ে উত্তেজনা, অবরুদ্ধ ৬ জনকে উদ্ধার

বিয়ানীবাজার সংবাদদাতা: সিলেটের বিয়ানীবাজারে কুশিয়ারা নদী থেকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, হামলা ও অবরুদ্ধ করে রাখার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চার শ্রমিকসহ ছয়জনকে অবরুদ্ধ করে রাখার পর পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। একই ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চার সাংবাদিক বাধা ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাতে উপজেলার শেওলা ইউনিয়নের দীঘলবাক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দীঘলবাক এলাকায় কুশিয়ারা নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজারের সাহায্যে বালু সরানোর কাজ শুরু হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়দের সঙ্গে ইজারাদারপক্ষের বিরোধ দেখা দিলে ড্রেজার, নৌকা ও চার শ্রমিককে আটকে রাখা হয়। পরে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করতে গিয়ে আরও দুই ব্যক্তি অবরুদ্ধ হন।


স্থানীয়দের দাবি, ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের কারণে তাঁরা ড্রেজার ও শ্রমিকদের আটকে রাখেন। তাঁদের আশঙ্কা, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে বসতবাড়ি ও পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।


অন্যদিকে, ইজারাদার জুবের আহমদ অভিযোগ করেন, এলাকার উন্নয়নের নামে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। দাবিকৃত অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় একটি পক্ষ বালু উত্তোলন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেছে। তবে অভিযুক্তরা চাঁদা দাবি ও হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


সমঝোতার চেষ্টা, পরে আরও দুজন অবরুদ্ধ


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে বিকেল ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে যান শেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুর উদ্দিন। তিনি উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন। তবে ইজারাদারপক্ষের সব নৌযান নদী থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠায় সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।


পরে পার্শ্ববর্তী দুবাগ ইউনিয়নের গোয়ালপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ছেলে জাকির হোসেন বিরোধ মেটাতে ঘটনাস্থলে যান। তাঁদের অভিযোগ, মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় কয়েকজন তাঁদের মারধর করে ফেলে দেন এবং পরে অবরুদ্ধ করে রাখেন।


রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ তাঁদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। নাজিম উদ্দিন ও জাকির হোসেনের অভিযোগ, হামলাকারীরা তাঁদের পকেট থেকে দুই লাখ টাকার বেশি নিয়ে গেছে এবং একটি মূল্যবান চশমা ভেঙে ফেলেছে। এ ঘটনায় তাঁরা থানায় অভিযোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন।


ইজারাদারের পাল্টা অভিযোগ


ইজারাদার জুবের আহমদ অভিযোগ করেন, স্থানীয় চুনু মিয়ার ইন্ধনে ফয়ছল আহমদ মিজু, নোমান আহমদ, এমরান আহমদ, আশরাফসহ ১০ থেকে ১২ জন এ ঘটনায় জড়িত। তাঁর দাবি, প্রথম দফায় অর্থ দেওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় দাবিকৃত অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় নদীভাঙনের বিষয়টি সামনে এনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়।


তবে জুবের আহমদ স্বীকার করেন, ড্রেজারটি ইজারার নির্ধারিত এলাকার বাইরে ছিল। তাঁর ভাষ্য, নদীর পানি কমে যাওয়ায় তাঁদের বালুবোঝাই স্টিমার তলদেশে আটকে যায়। পরে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আর্থিক বরাদ্দের বিনিময়ে নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে নদীর তলদেশ থেকে বালু সরানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়। সেই অনুযায়ী কাজ শুরু হলে অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় বলে দাবি করেন তিনি।


জুবের আহমদ আরও জানান, স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ড্রেজার দিয়ে বালু সরানোর বিষয়ে সমঝোতার একটি অডিও রেকর্ড তাঁর কাছে রয়েছে, যা তিনি সাংবাদিকদের দিয়েছেন। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেকর্ডিংয়ে ফয়ছল আহমদ মিজু নামে এক যুবককে পরদিন সকাল থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার আশ্বাস দিতে শোনা যায়। তবে অডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


সংবাদ সংগ্রহে চার সাংবাদিককে বাধা ও হুমকির অভিযোগ


এদিকে, ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধা ও হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন চার সাংবাদিক। তাঁরা হলেন—দৈনিক নয়াদিগন্ত ও জালালাবাদ পত্রিকার প্রতিনিধি তোফায়েল আহমেদ, দৈনিক কালবেলা ও সিলেটের ডাকের প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম সাজু, দৈনিক তৃতীয় মাত্রার প্রতিনিধি জয়নুল ইসলাম এবং দৈনিক সুরমা মেইলের প্রতিনিধি মো. জয়নুল ইসলাম।


সাংবাদিকদের অভিযোগ, অডিও রেকর্ডের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন আহমদ ও আশরাফ আহমদ নামে দুই যুবক তাঁদের দিকে তেড়ে আসেন। এ সময় তাঁদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করার পাশাপাশি গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।


অন্যদিকে, অভিযুক্ত চুনু মিয়া বলেন, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ড্রেজারের শ্রমিকদের ইজারাদারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাজিম উদ্দিন ও তাঁর ছেলে জাকির হোসেনকে নিরাপত্তার জন্য তাঁর বাড়িতে রাখা হয়েছিল। তাঁদের ওপর কোনো হামলা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।


প্রশাসনের বক্তব্য


শেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহুর উদ্দিন বলেন, ইজারাবহির্ভূত জায়গা থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয়রা ড্রেজার ও শ্রমিকদের অবরুদ্ধ করে রেখেছেন—এমন খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। ইউএনওর নির্দেশে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে রাতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় চার শ্রমিক ও স্থানীয় দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়।


বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল করিম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করেছে। বর্তমানে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিয়ানীবাজারের ইউএনও উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ইজারাবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্থানীয়রা শ্রমিক ও কয়েকজন ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ পাঠিয়ে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ জানাননি। তবে দীর্ঘ সময় কাউকে অবরুদ্ধ করে রাখাও উচিত হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার বিষয়ে ইউএনও বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা অনুচিত। তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।


বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এ বিরোধে চাঁদা দাবি, হামলা, অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া ও সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদীর ইজারার নির্ধারিত সীমানা মেনে বালু উত্তোলন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/18167
Page of