logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
মৌলভীবাজার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
চায়ের পাতা থেকে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার পথে

কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের চম্পা নাইডুর স্বপ্নজয়

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন মৌলভীবাজার
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৩১ পূর্বাহ্ন
কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের চম্পা নাইডুর স্বপ্নজয়

কুলাউড়া প্রতিনিধি:

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সবুজে ঘেরা লংলা চা-বাগান। পাহাড়ের কোলঘেঁষা এই চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান চম্পা নাইডু। সীমিত সুযোগ, নানা প্রতিকূলতা আর দীর্ঘ সংগ্রাম পেরিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের পথচলা এখন পৌঁছেছে ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণায়।


চম্পার এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত উচ্চশিক্ষার গল্প নয়; চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষের জীবন, শিক্ষা, অধিকার ও সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নিজের শেকড়ের মানুষের জন্য কাজ করার এক দীর্ঘ প্রত্যয়ের গল্পও। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর শিক্ষাজীবন ও উচ্চশিক্ষার এই ধারাবাহিকতার তথ্য পাওয়া যায়।


বিনা খরচে পড়াশোনা থেকে স্বপ্নের শুরু


চম্পা নাইডুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ২০১০ সালে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি ভর্তি হন চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য পরিচালিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে। সেখানে তিনি বিনা খরচে পড়াশোনা ও আবাসনের সুযোগ পান।


সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে পড়াশোনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন চম্পা। ২০১৫ সালে ক্যামেলিয়া ডানকান হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে কুলাউড়ার ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুই পরীক্ষাতেই তাঁর জিপিএ-৫ অর্জনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তিও লাভ করেন।


শেকড়ের মানুষের জন্য কাজ


উচ্চমাধ্যমিকের পর চম্পা ভর্তি হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের শেকড়ের মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অব্যাহত থাকে।


চা-বাগানের শ্রমিক ও তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা, মৌলিক অধিকার ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে চম্পার আগ্রহ আরও গভীর হয়। চা-শ্রমিকদের জীবন, সামাজিক বৈষম্য, মানবাধিকার এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর একাডেমিক আগ্রহের ক্ষেত্রও তৈরি হয়।


শৈশব থেকেই চা-বাগানের মানুষের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও অধিকারসংক্রান্ত নানা বাস্তবতা তাঁর চিন্তায় প্রভাব ফেলে। ফলে নিজের শেকড়ই একসময় হয়ে ওঠে তাঁর গবেষণার আগ্রহের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।


ICCR স্কলারশিপে ভারতে পাড়ি


উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে আরও এগিয়ে নিতে ২০২৩ সালে চম্পা নাইডু লাভ করেন ভারত সরকারের Indian Council for Cultural Relations (ICCR) স্কলারশিপ। এই স্কলারশিপের মাধ্যমে তিনি ভারতে গিয়ে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হন।


অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার পেছনে শুধু একাডেমিক বিষয় নয়, তাঁর পারিবারিক শেকড়ের টানও কাজ করেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চম্পা তেলুগু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং তাঁর পূর্বপুরুষদের শেকড় অন্ধ্র প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কিত অঞ্চলে থেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথ তৈরি করার আগ্রহ ছিল তাঁর।


এবার লক্ষ্য পিএইচডি


২০২৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ICCR স্কলারশিপ লাভ করেন চম্পা নাইডু। এরপর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন তিনি।


প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএইচডির জন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সুযোগ পেয়েছিলেন চম্পা। তবে নিজের পারিবারিক শেকড় ও অন্ধ্র প্রদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।


বর্তমানে তাঁর গবেষণার সময়কাল ২০২৫ থেকে ২০২৮ সাল। এই গবেষণায় বাংলাদেশের চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষের জীবন, মানবাধিকার, সামাজিক বাস্তবতা, জীবনমান এবং তাঁদের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের সম্ভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে।


গবেষণার কেন্দ্রে চা-শ্রমিক


চম্পা নাইডুর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের শেকড়ের মানুষের জীবনকে একাডেমিক গবেষণার বিষয় হিসেবে সামনে আনা।


তিনি মনে করেন, শুধু চা-শ্রমিকদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়; এসব সমস্যার সমাধানের পথও খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কীভাবে নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করা যায়, কীভাবে তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়—এসব প্রশ্ন তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।


তাঁর গবেষণার মূল ভাবনার সঙ্গে পাবলিক পলিসি ও হিউম্যান রাইটস-এর বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে চা-শ্রমিকদের জীবন, মানবাধিকার, সামাজিক বাস্তবতা এবং জীবনমান উন্নয়নের নীতিগত সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।


চা-বাগানের মেয়েদের জন্য অনুপ্রেরণা


লংলা চা-বাগানের যে পরিবেশে চম্পার বেড়ে ওঠা, সেই পরিবেশের অনেক মেয়ের কাছেই তাঁর পথচলা অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে।


একসময় যে চা-বাগানের মেঠোপথ ধরে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু, সেই চম্পাই এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত। তবে নিজের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হননি তিনি। বরং চা-শ্রমিকদের জীবন ও অধিকার নিয়ে গবেষণার মধ্য দিয়ে নিজের বেড়ে ওঠা সমাজকেই একাডেমিক পরিসরে তুলে ধরছেন।


চম্পা নাইডুর এই যাত্রায় রয়েছে শিক্ষা অর্জনের সুযোগকে কাজে লাগানো, প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলা, নিজের শেকড়ের প্রতি টান এবং চা-শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয়।


লংলা চা-বাগান থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা এখন অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণার টেবিলে। ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর গবেষণা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের জীবন ও অধিকার নিয়ে নীতিগত আলোচনায় নতুন তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে পারে—এটাই এখন তাঁর পথচলার বড় প্রত্যাশা।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/17786
Page of