৭০ পেরিয়েও বাঁশ-বেতের কারিগর তাজুল, আঁকড়ে ধরে আছেন হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য
গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি:
যে বয়সে পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে আরাম-আয়েশে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেও জীবিকার তাগিদে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন মোহাম্মদ তাজুল হক। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। তারপরও থেমে নেই তাঁর কর্মযজ্ঞ। গ্রামীণ বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী। জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পকে ধরে রাখারও চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ২ নম্বর পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের মাতুরতল বাজারের এই ব্যবসায়ী ও পূর্ব পান্তুমাই গ্রামের বাসিন্দা তাজুল হক দীর্ঘদিন ধরে বাঁশ-বেতের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে আসছেন। বয়সের ভারে শরীর অনেকটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে ভাটা পড়েনি।
সর্বসাকুল্যে প্রায় ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা তাঁর বাঁশ-বেতের ব্যবসা এখন শুধু স্থানীয় মানুষের চাহিদাই পূরণ করছে না; উপজেলার বাইরেও এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সীমিত পুঁজি ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রম ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরেই বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর ব্যবহার ছিল। খারা, কুলা, টুকরি, পাখা, বেলাইন, পাটি, ডামসহ নানা ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করা হতো। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল এসব পণ্য। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া ও প্লাস্টিকসহ নানা কৃত্রিম সামগ্রীর ব্যাপক ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই কুটির শিল্প।
তবে সময়ের এই পরিবর্তনের মধ্যেও ব্যতিক্রম তাজুল হক। বয়সের ভার, পারিবারিক দায়িত্ব ও জীবিকার চাপ—সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে তিনি এখনো বাঁশ-বেতের কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর হাতে তৈরি হচ্ছে গ্রামীণ জীবনে ব্যবহৃত নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
তাজুল হকের কাছে বাঁশ-বেতের কাজ শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি তাঁর কাছে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি অংশ। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বাঁশ-বেতের তৈরি এসব সামগ্রীর প্রয়োজনীয়তা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক তুলে ধরতেই তিনি এই কাজ ধরে রেখেছেন।
স্থানীয়দের মতে, একসময় গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার ছিল স্বাভাবিক বিষয়। সময়ের সঙ্গে এসব পণ্যের ব্যবহার কমে গেলেও তাজুল হকের মতো কারিগররা এখনো সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর মতো মানুষের হাত ধরেই হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ কুটির শিল্প টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।
নয় সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ৭০ বছরের বেশি বয়সেও তাজুল হকের কর্মজীবন অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বয়স তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং পরিবারের দায়িত্ব ও নিজের পেশার প্রতি দায়বদ্ধতাই তাঁকে এখনো কর্মমুখর রেখেছে।
তাজুল হক বলেন, এই কাজ করে তিনি একদিকে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছেন, অন্যদিকে বাঁশ-বেতের পুরোনো কাজটিও ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পেলে তাঁর হস্তশিল্পের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে বাঁশ-বেতের তৈরি এসব ঐতিহ্যবাহী পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও মানুষের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা বাঁশ-বেতের কুটির শিল্প আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এমন বাস্তবতায় ৭০ পেরিয়েও তাজুল হকের এই প্রচেষ্টা শুধু তাঁর পরিবারের জীবিকা নয়, বরং বাংলার প্রাচীন গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখারও একটি নিরন্তর প্রয়াস।