বন উজাড় ও আবাসস্থল সংকটে লোকালয়ে বন্যপ্রাণী, শ্রীমঙ্গলে এক মাসে উদ্ধার ২০
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
চা-বাগান, বন, টিলা ও জলাভূমিবেষ্টিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধার। কিন্তু সেই প্রকৃতির বাসিন্দারাই এখন বারবার ঢুকে পড়ছে মানুষের বসতবাড়ি, আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি ও খামারে। কখনো ঘরের সিলিংয়ে অজগর, কখনো মাছ ধরার জালে দাঁড়াশ, আবার কখনো বসতঘরে বিষধর শঙ্খিনী—এভাবেই লোকালয়ে বাড়ছে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি।
শুধু আগস্ট মাসেই শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ১৭টি বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, একটি শঙ্খচিল ও দুটি বানর। উদ্ধার হওয়া সাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজগর—৯টি। এর মধ্যে একটি ছিল মৃত।
বন্যপ্রাণীর এভাবে ঘন ঘন লোকালয়ে চলে আসাকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না পরিবেশকর্মী ও বন্যপ্রাণী সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বনভূমি সংকুচিত হওয়া, প্রাকৃতিক আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ, খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের পরিবর্তন এবং বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক-রেলপথ নির্মাণসহ নানা কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গরম ও বর্ষার মৌসুমে বন্যপ্রাণীর চলাচল বেড়ে যাওয়াও লোকালয়ে তাদের চলে আসার একটি কারণ হতে পারে।
আগস্টজুড়ে একের পর এক উদ্ধার
আগস্টের শুরুতেই হাইল হাওরের ধানখেত থেকে অজগর উদ্ধারের মধ্য দিয়ে মাসব্যাপী এ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর, ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি বেত আঁচড়া। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে উদ্ধার করা হয় একটি মৃত অজগর।
১২ আগস্ট শাহীবাগ থেকে একটি শঙ্খচিল উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ১৩ আগস্ট উদ্ধার করা অজগরটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২ ফুট এবং ওজন প্রায় ১৬ কেজি। পরে সেটিকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৫ আগস্ট ছিল উদ্ধার অভিযানের অন্যতম ব্যস্ত দিন। ওই দিন রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।
নোয়াগাঁওয়ে মাছ ধরার জালে আটকে পড়া দাঁড়াশ সাপটিকে স্থানীয়রা না মেরে ফাউন্ডেশনে খবর দেন। পরে উদ্ধারকারী দল গিয়ে সাপটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। স্থানীয়দের এ সচেতনতা বন্যপ্রাণী রক্ষায় ইতিবাচক দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ এবং ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরেকটি শঙ্খিনী সাপ। অত্যন্ত বিষধর এ সাপটিকেও নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
মাসের শেষ সপ্তাহেও থামেনি উদ্ধার কার্যক্রম। ২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সাপটির প্রজাতি শনাক্ত করা হয়। ঘটনাটি পৃথকভাবেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
‘খাবারের সংকটে প্রাণী লোকালয়ে আসছে’
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, ‘বনের ভেতরে খাবারের সংকট এবং বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের কারণে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।’
তিনি বলেন, উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিয়ে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
বন উজাড়ের বিষয়টি উল্লেখ করে স্বপন দেব সজল বলেন, ‘বন উজাড় হচ্ছে, খাবার না থাকলে প্রাণী কীভাবে থাকবে? এ বিষয়ে বন বিভাগের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
হাইল হাওর থেকে অজগর উদ্ধারের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, কৃষকেরা প্রথমে সাপটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় একজন ব্যক্তি বাধা দিয়ে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল গিয়ে অজগরটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।
‘বন্যপ্রাণী দেখলেই হত্যা নয়’
পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেটিকে হত্যা করেন। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, বাড়ি বা লোকালয়ে সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল বা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
তার মতে, সাপসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীকে হত্যা না করে নিরাপদে উদ্ধার করে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।
বন বিভাগের বক্তব্য
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগস্টের শুরুতে উদ্ধার করা অজগরটির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে বনে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এক মাসে এত বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন গরম ও বর্ষার সময়। এ কারণে হয়তো প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। তা ছাড়া খাবার ও অন্যান্য কোনো সংকট নেই।’
তবে বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেলপথ চলে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এতে অনেক প্রাণী আহত বা মারা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, সড়কপথের বিন্যাস বা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে প্রাণীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দিন দিন বনে প্রাণী বাড়ছে, কমছে না। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি প্রাণী দেখা যাচ্ছে।’
আবাসস্থল রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ
বন বিভাগের এ বক্তব্যের সঙ্গে পরিবেশকর্মীদের পর্যবেক্ষণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি শুধু মৌসুমি চলাচলের ফল নয়; এর সঙ্গে তাদের আবাসস্থল, খাদ্য ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রের বিষয়টিও জড়িত।
শ্রীমঙ্গলের বন, চা-বাগান, টিলা ও জলাভূমি ঘিরে মানুষের বসতি ও অবকাঠামো ক্রমেই বাড়ছে। এসব এলাকায় বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে তারা বিকল্প পথ হিসেবে মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা আবাসিক এলাকায় চলে আসতে পারে।
বিশেষ করে সাপের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এলাকার ইঁদুর, ব্যাঙ, মাছসহ খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন উপাদানের অবস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি বাড়লে আতঙ্কিত হয়ে প্রাণী হত্যা না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী দল বা বন বিভাগকে খবর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের পথ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। তাহলেই মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমিয়ে শ্রীমঙ্গলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।