logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
বিচিত্র খবর ০৪ আগস্ট ২০২৬ ১১:১৮ অপরাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২ রাজ: সিন্টেং সমাজের স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক কাঠামোর ইতিহাস

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ০৪ আগস্ট ২০২৬ ১১:১৮ অপরাহ্ন বিচিত্র খবর
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ০৪ আগস্ট ২০২৬ ১১:১৮ অপরাহ্ন
জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২ রাজ: সিন্টেং সমাজের স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক কাঠামোর ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক:


বর্তমান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম জৈন্তিয়া পাহাড়জুড়ে একসময় গড়ে উঠেছিল সিন্টেং জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসিত ১২টি ‘রাজ’। এগুলো ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের পার্বত্য প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজস্ব শাসনব্যবস্থা, সামাজিক সংগঠন ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে এসব রাজ দীর্ঘদিন ধরে জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।


গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের তথ্যমতে, পুরাতত্ত্ববিদ রাজমোহন নাথের গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে যে, জৈন্তিয়া পাহাড়ের অধিবাসী সিন্টেংরা আদি Tsin বংশের লোক এবং তাদের প্রাচীন আবাসভূমির নাম ছিল Teing। এই দুটি শব্দের সমন্বয় থেকেই Tsinteing বা Synteng শব্দের উৎপত্তি, যা পরবর্তীতে ‘জৈন্তিয়া’, ‘জয়ন্তীয়া’ বা ‘জৈন্তা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।


ছোট ছোট বসতি থেকেই শুরু


প্রাচীনকালে জৈন্তিয়া পাহাড়ে সিন্টেংদের জনসংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম এবং সমাজব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত সরল। প্রতিটি বসতি পরিচালিত হতো একজন প্রধানের মাধ্যমে, যাকে বলা হতো লাংদহ। তিনি একই সঙ্গে ধর্মযাজক, বিচারক ও প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতিটি বসতি ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং লাংদহদের ওপর অন্য কোনো কর্তৃত্ব ছিল না।


সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজব্যবস্থাও পরিবর্তিত হতে থাকে। বিভিন্ন ‘কুর’ বা গোত্রের সমন্বয়ে বড় বড় ক্নং (বসতি) গড়ে ওঠে। কয়েকটি ক্নং মিলে একটি রাইদ এবং কয়েকটি রাইদ মিলে একটি পুঞ্জি বা এলাকা গঠিত হয়।


১২ পুঞ্জির প্রধান ছিলেন দলই


সিন্টেং সমাজে মোট ১২টি পুঞ্জি বা এলাকা ছিল। প্রতিটি পুঞ্জির প্রধানকে বলা হতো দলই। এই ১২ জন দলই পুরো সিন্টেং সমাজ পরিচালনা করতেন এবং তাদের ওপর অন্য কোনো শাসকের কর্তৃত্ব ছিল না।


সমাজকে আরও সুসংগঠিত করতে দলইরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান হিসেবে নির্বাচন করতেন। তাঁর উপাধি ছিল সিয়েম। সিয়েমের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ১২টি পুঞ্জিকে বলা হতো হিমা। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, সুতংগা পুঞ্জির দলইকেই সাধারণত হিমার সিয়েম নির্বাচিত করা হতো।


সিয়েম থেকে জৈন্তিয়ার রাজা


গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে সুতংগা পুঞ্জির দলই তথা হিমার সিয়েম মানগোসাঁই (বড়গোসাঁই) জৈন্তিয়া সমভূমির শাসনভার লাভ করেন। তিনিই সমতলে সিন্টেং রাজবংশের সূচনা করেন।


একই ব্যক্তি যখন হিমার সিয়েম ও সমতলের রাজা হন, তখন জৈন্তিয়া পাহাড় ও সমভূমির মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে রাজবংশের প্রথম দিকের শাসকদের সিন্টেংরা কেবল সিয়েম হিসেবেই স্বীকৃতি দিতেন; রাজা হিসেবে নয়।


খুব সম্ভবত রাজা যশোমাণিকের শাসনামল থেকে সিন্টেং দলইরা রাজদরবারে অংশ নিতে শুরু করেন। এরপর থেকেই হিমার সিয়েম সিন্টেংদের কাছেও রাজা হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং ১২টি পার্বত্য পুঞ্জি জৈন্তিয়ার ‘রাজ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।


স্বায়ত্তশাসিত ছিল ১২ রাজ


জৈন্তিয়া রাজ্যের অংশ হলেও এসব পার্বত্য রাজ ছিল সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত। প্রতিটি এলাকার দলই নিজস্ব প্রশাসন, জনবল ও অর্থবল নিয়ে স্বাধীনভাবে এলাকা পরিচালনা করতেন।


তারা রাজাকে কোনো কর দিতেন না। তবে আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর শারদীয় উৎসব উপলক্ষে একটি করে বলির পাঁঠা রাজদরবারে পাঠাতেন। ১২টি এলাকা থেকে মোট ১২টি বলির পাঁঠা রাজার কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।


গবেষকদের মতে, এটি ছিল প্রতীকী আনুগত্যের নিদর্শন। একই সঙ্গে জৈন্তিয়া রাজ্যকে বহিরাগত শক্তির আক্রমণ থেকে রক্ষায় সিন্টেং দলইদের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে বহিরাগত কোনো শক্তির পক্ষে জৈন্তিয়া দখল করা সম্ভব হয়নি।


জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২ রাজ


গবেষণায় উল্লেখিত জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২টি রাজ বা পুঞ্জি হলো—


১. Sutnga

২. Nartiang

৩. Nongtalang

৪. Nangphyllut (Norpuh)

৫. Nongjngi

৬. Nangbah

৭. Lakadong

৮. Shangpung

৯. Mynso

১০. Jowai

১১. Raliang

১২. Amwi (Rambhai)


বর্তমান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব জৈন্তিয়া পাহাড় ও পশ্চিম জৈন্তিয়া পাহাড় জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এসব ঐতিহাসিক পুঞ্জির অবস্থান ছিল।


ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়


গবেষক আসিফ আযহারের মতে, জৈন্তিয়া পাহাড়ের ১২ রাজ শুধু প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল না; বরং সিন্টেং সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ঐতিহ্যের অন্যতম ভিত্তি। এই স্বায়ত্তশাসিত শাসনব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জৈন্তিয়া রাজ্যের শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।


তথ্যসূত্র: গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের গবেষণালব্ধ তথ্য।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/16758
Page of