পলাশীর যুদ্ধের পর’: একটি তৈলচিত্রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণার ঐতিহাসিক দলিল
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয়ের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে যে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সূচনা হয়, তারই এক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পিত প্রতিফলন হলো ব্রিটিশ শিল্পী ফ্রান্সিস হেইম্যানের আঁকা ‘রবার্ট ক্লাইভ ও মীর জাফর: পলাশীর যুদ্ধের পর’ শীর্ষক তৈলচিত্র।
প্রায় ১৭৬০ সালে অঙ্কিত এই চিত্রকর্মে ঘোড়ার পিঠে থাকা ব্রিটিশ কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভ এবং বশ্যতা স্বীকারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলার নবনিযুক্ত নবাব মীর জাফরের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি একজন ভারতীয় সহিস (ঘোড়ার পরিচর্যাকারী) ও একটি হাতিকেও ছবির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ছবিটি শুধু একটি ঘটনা চিত্রায়ণ নয়; এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রচারণারও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শিল্পী ফ্রান্সিস হেইম্যান কখনোই ভারতে আসেননি। ফলে ভারতীয় প্রকৃতি, হাতি ও পরিবেশের চিত্রায়ণে বাস্তবতার পরিবর্তে ইউরোপীয় কল্পনা ও পরোক্ষ বর্ণনার প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তৎকালীন সময়ে ব্রিটেন ফ্রান্সের সঙ্গে ‘সাত বছরের যুদ্ধ’-এ জড়িত ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জাতীয় মনোবল বৃদ্ধি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শক্তি ও সাফল্য তুলে ধরতে এ ধরনের শিল্পকর্ম নির্মাণে উৎসাহ দেওয়া হতো। ছবিটির মাধ্যমে স্থানীয় ভারতীয় রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তিশালী শাসকদেরও ব্রিটিশ কর্তৃত্বের অধীনে আনার সক্ষমতা তুলে ধরাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
চিত্রকর্মটির প্রাথমিক খসড়া বা প্রস্তুতিমূলক সংস্করণ বর্তমানে লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারির সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে। পরে ১৭৬২ সালে লন্ডনের জনপ্রিয় জনবিনোদন কেন্দ্র ভক্সহল গার্ডেনসে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য এর আরও বৃহৎ আকারের চূড়ান্ত সংস্করণ তৈরি করা হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এমন জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সাম্প্রতিক সাম্রাজ্যিক বিজয়কে কেন্দ্র করে বিশাল ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম প্রদর্শনের মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রাচ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যিক প্রভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও সমর্থন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
তথ্যসূত্র: শাম ঠাকুর
প্রকাশকাল: বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬।