জৈন্তিয়া সমভূমিতে ছিল ১৮টি ‘রাজ’: ইতিহাসের বিস্মৃত প্রশাসনিক কাঠামোর চিত্র তুলে ধরলেন গবেষক আসিফ আযহার
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বর্তমান সিলেট জেলার একাংশজুড়ে বিস্তৃত জৈন্তিয়া সমভূমি একসময় ১৮টি পৃথক ‘রাজ’-এ বিভক্ত ছিল। সিন্টেং বা জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর রাজাদের শাসনামলে এসব ‘রাজ’ ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রশাসনিক একক। আয়তনে ছোট হলেও কার্যক্রম ও প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এগুলো ছিল একটি প্রদেশের সমতুল্য।
গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের গবেষণালব্ধ তথ্যমতে, জৈন্তিয়া সমভূমির ১৮টি রাজ সমমর্যাদার ছিল না। এর মধ্যে ১০টি ছিল প্রধান রাজ এবং বাকি ৮টি ছিল ‘জুলাই রাজ’, যা বিভিন্ন হাজারকি রাজের অধীনে পরিচালিত হতো।
চারটি খেলুরাজ ছিল সবচেয়ে প্রাচীন
জৈন্তিয়া সমভূমির সবচেয়ে প্রাচীন জনপদগুলো চারটি ‘খেলুরাজ’-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এগুলো হলো— জয়ন্তাপুরী রাজ, জাফলং রাজ, চারিকাটা রাজ ও ফালজুর রাজ। সিন্টেং রাজবংশের উত্থানেরও আগে এসব এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠেছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
খেলুরাজগুলোর মধ্যে জয়ন্তাপুরী রাজের আয়তন ছিল ৫৯.১৫ বর্গমাইল (বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা), জাফলং ৪০.০৭ বর্গমাইল (বর্তমান গোয়াইনঘাট উপজেলা), চারিকাটা ৩৭.৮৮ বর্গমাইল (বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা) এবং ফালজুর ৩১.৮৪ বর্গমাইল (বর্তমান কানাইঘাট উপজেলা)।
ছয়টি ছিল হাজারকি রাজ
প্রধান প্রশাসনিক কাঠামোর দ্বিতীয় স্তরে ছিল ছয়টি ‘হাজারকি রাজ’। এগুলো হলো— ধরগাম, চতুল, খরিল, পাঁচভাগ, আড়াইখা ও চাউরা।
এর মধ্যে ধরগাম রাজ ছিল সবচেয়ে বড়, যার আয়তন ছিল ১০৫.৭৮ বর্গমাইল। বর্তমানে এর বিস্তৃতি গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায়। এছাড়া চতুল (৩৩.৯৫ বর্গমাইল), খরিল (৪৬.৯৫ বর্গমাইল), পাঁচভাগ (৭৩.৪৯ বর্গমাইল), আড়াইখা (৬৩.৪১ বর্গমাইল) এবং চাউরা (৯.৯২ বর্গমাইল) রাজ বর্তমান কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত ছিল।
পরে যুক্ত হয় আটটি জুলাই রাজ
সিন্টেং রাজাদের শাসনামলে জৈন্তিয়ার কিছু নিম্নভূমি ও হাওর অঞ্চল পলিমাটিতে ভরাট হয়ে নতুন জনবসতিতে পরিণত হলে সেসব এলাকাকে বিভিন্ন হাজারকি রাজের অধীনে ‘জুলাই রাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই জুলাই রাজের সংখ্যা ছিল আটটি। এর মধ্যে সাতটি বর্তমান কানাইঘাট উপজেলায় এবং একটি বর্তমান কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ছিল।
জুলাই রাজগুলো হলো— মুলাগুল (৫৯.১৪ বর্গমাইল), সাতবাক (৩৬.৮৫), বাজেরাজ (১২.১৫), পশ্চিমভাগ (৪.৫৪), বড়দেশ (৩.০৯), বাউরভাগ (১৯.৬৩), বর্ণফৌদ (৬৬.৮৩) এবং পিয়াইনগুল (৭৪.০৬ বর্গমাইল)।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এসব জুলাই রাজের প্রতিনিধিরা সরাসরি জৈন্তিয়া রাজদরবারে অংশ নিতেন না। যে হাজারকি রাজের অধীনে তারা পরিচালিত হতো, সেই রাজের প্রধানই তাদের পক্ষে দরবারে প্রতিনিধিত্ব করতেন।
রাজদরবারে ছিল ২২ জন প্রতিনিধির অংশগ্রহণ
জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, রাজদরবারে মোট ২২ জন ‘রাজ-প্রতিনিধি’ অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন। এর মধ্যে সমতল অঞ্চল থেকে অংশ নিতেন ১০ জন, অর্থাৎ চারটি খেলুরাজ ও ছয়টি হাজারকি রাজের প্রতিনিধিরা। অপরদিকে পার্বত্য অঞ্চল থেকে অংশ নিতেন ১২ জন পুঞ্জি বা এলাকা রাজের প্রতিনিধি।
ব্রিটিশ আমলে বিলুপ্ত হয় রাজ-ব্যবস্থা
১৮৩৫ সালে জৈন্তিয়ায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর শতাব্দীপ্রাচীন ‘রাজ-ব্যবস্থা’ বিলুপ্ত করা হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন জৈন্তিয়া সমভূমির ১৮টি রাজকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব প্রশাসনের আওতাধীন ১৮টি পরগনায় রূপান্তর করে।
পরবর্তীতে ১৮৫৬ সালের চতুর্থ বন্দোবস্তের সময় পশ্চিমভাগ পরগনাকে বাজেরাজ পরগনার সঙ্গে একীভূত করা হলে পরগনার সংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১৭-তে দাঁড়ায়। এরপর থেকেই অঞ্চলটি ‘জৈন্তিয়া ১৭ পরগনা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
যদিও পাকিস্তান আমলে পরগনা-ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়, তবুও ‘জৈন্তিয়া ১৭ পরগনা’ নামটি এখনও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থানীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বহুল প্রচলিত।
গবেষক আসিফ আযহারের মতে, জৈন্তিয়া সমভূমির এই ১৮টি রাজ শুধু প্রশাসনিক এককই ছিল না; বরং সেগুলো জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই বিস্মৃত প্রশাসনিক কাঠামো আজও জৈন্তিয়া অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত।
তথ্যসূত্র: গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের গবেষণালব্ধ তথ্য।