নামাজের আরকান বা ছয়টি ফরজ: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
নামাজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, শর্ত ও আরকান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হানাফি ফিকহের বিভিন্ন কিতাবে নামাজের ফরজ ও আরকান গণনার ক্ষেত্রে কিছু পরিভাষাগত ও মতভেদভিত্তিক আলোচনা পাওয়া যায়। এসব বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।
তিনি তাঁর আলোচনার শুরুতে বলেন—‘নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ’।
তিনি উল্লেখ করেন, হেদায়া কিতাবে নামাজের আরকান বা ফরজ হিসেবে ছয়টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. তাকবীরে তাহরীমা
২. কিয়াম
৩. কেরাত
৪. রুকু
৫. সিজদাহ
৬. আখেরী বৈঠক।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর বাইরে শরহে বেকায়া কিতাবে নামাজ থেকে বের হওয়ার বিষয়টিকেও একটি ফরজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এ হিসাবে ফরজের সংখ্যা ১৪টি হিসেবে গণনা করা হয়।
এ ছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, দুররুল হেকাম কিতাবে নামাজের কিয়াম ও রুকুর তরতীবের প্রতি লক্ষ্য রাখার বিষয়টি এবং মুনিয়া কিতাবে তা‘দিলে আরকান তথা নামাজের রোকনগুলো যথাযথভাবে আদায় করার বিষয়টি ফরজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয় যুক্ত করে ভিন্ন হিসাব করলে ফরজের সংখ্যা আরও বেশি হয়।
নামাজ থেকে বের হওয়ার বিষয়ে ফিকহি মতভেদ
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী বলেন, নামাজ থেকে বের হওয়ার জন্য কোনো কাজ করাকে ফরজ হিসেবে গণনার বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এটিকে ফরজ হিসেবে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এটিকে ওয়াজিব হিসেবে মত দিয়েছেন।
এ কারণে বিষয়টি মতভেদপূর্ণ হওয়ায় নামাজের প্রচলিত ফরজের তালিকায় এটি সর্বজনস্বীকৃতভাবে একইভাবে গণনা করা হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, কিয়াম ও রুকুর তরতীব যথাযথভাবে আদায় করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে নামাজের স্বাভাবিক নিয়মে কিয়াম ও রুকু যথাক্রমে আদায় হয়ে যাওয়ার কারণে কোনো কোনো আলেম পৃথকভাবে বিষয়টি ফরজের তালিকায় উল্লেখ করেননি।
তা‘দিলে আরকান নিয়েও রয়েছে মতভেদ
তা‘দিলে আরকান অর্থাৎ নামাজের রোকনগুলো যথাযথভাবে স্থিরতা ও নিয়মের সঙ্গে আদায় করার বিষয়েও ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।
তিনি বলেন, ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) তা‘দিলে আরকানকে ফরজ বলেছেন। অন্যদিকে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এটিকে ওয়াজিব হিসেবে মত দিয়েছেন। ফলে এটিও মতভেদপূর্ণ বিষয় হওয়ায় প্রচলিতভাবে নামাজের ১৩টি ফরজের সঙ্গে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
তাকবীরে তাহরীমা—ফরজ, নাকি নামাজের শর্ত?
তাঁর আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো তাকবীরে তাহরীমার অবস্থান নিয়ে।
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী বলেন, হেদায়া কিতাবে তাকবীরে তাহরীমাকে নামাজের রোকনের মধ্যে গণনা করা হয়েছে। তবে কেফায়া, বাহরুর রায়েক, জওয়াহারাতুন্নাইয়্যারা, মাজমাউল-আনহুর, মোলতাকাল-আবহুর, শরহে বেকায়া, জামেউর রমুজ, আলমগীরি, শরম্বালালিয়া, দুররুল মোখতার, হাশিয়ায়ে তাহতাবী, তাবইনুল হাকায়েক, মেফতাহুস সালাত, কাজী খান ও মারাকিল ফালাহসহ বিভিন্ন ফিকহি গ্রন্থে তাকবীরে তাহরীমাকে নামাজের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে এসব গ্রন্থে তাকবীরে তাহরীমাকে রোকনের আলোচনার মধ্যেও আনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কিয়ামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে রোকনের আলোচনায়
তিনি আরও বলেন, শামী, দুররুল মোখতার, তাবইনুল হাকায়েক, হাশিয়ায়ে তাহতাবী ও কবীরী প্রভৃতি গ্রন্থেও তাকবীরে তাহরীমাকে রোকনের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেখানে এটিকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে—তাকবীরে তাহরীমা কিয়ামের অত্যন্ত সংলগ্ন।
এ কারণে লেখক নিজেও হেদায়া ও অন্যান্য উল্লিখিত কিতাবের অনুসরণে তাকবীরে তাহরীমাকে রোকনের আলোচনার মধ্যে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মূলত তাকবীরে তাহরীমা নামাজের একটি শর্ত।
নামাজের বিষয়গুলো জানা জরুরি
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী বলেন, নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, শর্ত ও আরকান সম্পর্কে মুসলমানদের জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন ফিকহি গ্রন্থে বিষয়গুলোর শ্রেণিবিন্যাস ও গণনায় যে মতভেদ রয়েছে, তা বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ ও আলেমদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করতে হবে।
তিনি তাঁর আলোচনার শেষে মহান আল্লাহর কাছে নিজের এই শ্রম কবুলের জন্য দোয়া করেন।
তিনি বলেন, “ইয়া আল্লাহ, আমার এই শ্রমগুলো জান্নাতের ঝরিয়া হিসেবে কবুল করুন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের বিষয়গুলো জানার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।”
লেখক পরিচিতি
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট। তিনি জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়া তিনি সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতীব, উপশহর সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল এবং দক্ষিণ সুরমা সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসার সাবেক প্রধান শিক্ষক।