সংস্কার হচ্ছে সারা দেশের গ্রামীণ সড়ক, বরাদ্দ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
অনলাইন ডেস্ক।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে সারা দেশের গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য, গ্রামীণ সড়ক, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
তিনি জানান, অনুমোদিত ১০টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে ৮ হাজার ৪৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ থেকে আসবে ৯৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন
স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করা’ বাস্তবায়ন করবে। দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলা ও সব উপজেলায় প্রকল্পটির আওতায় ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ৭ হাজার মিটার সেতু ও কালভার্ট পুনর্বাসন করা হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়কের অবস্থা মূল্যায়ন করে যেসব এলাকায় মানুষ সবচেয়ে বেশি যাতায়াত সমস্যায় ভুগছেন, সেসব সড়ককে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এগুলো মূলত মেরামতের কাজ। সড়ক সংস্কারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
গ্রামীণ সড়ককে আরও টেকসই করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম বছরে ১০০ কিলোমিটার সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে রাবার-বিটুমেন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিক অভিজ্ঞতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হবে।
ঢাকা মেডিকেলের পুরোনো স্থাপনা প্রতিস্থাপন
একনেক সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
দেশের প্রাচীনতম এ চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি ভবন, ছাত্রাবাস এবং অন্যান্য আবাসিক ও অনাবাসিক স্থাপনা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।
এ ছাড়া ১০টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ১৯টি হোস্টেল ভবন নির্মাণের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
স্মার্ট প্রযুক্তিতে হবে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে ‘বাংলাদেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন সেতুর স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নয়ন’ শীর্ষক ১১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা)-র সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে চারটি সেতুর অবস্থা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে সেতুর কাঠামোগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নদীভাঙন ও উপকূলীয় বাঁধে বরাদ্দ
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে লালমনিরহাট সদর উপজেলা রক্ষা প্রকল্পে ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করতে নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় হবে ৫৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় জোর
বিদ্যুৎ খাতের দুটি প্রকল্পও একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবে অতিরিক্ত ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকায় ডেসকোর এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে অতিরিক্ত ৬২৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদে ১০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলে সৌরবিদ্যুৎকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রামু সেনানিবাসে ১,৩১১ কোটি টাকার অবকাঠামো
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে রামু সেনানিবাসে ৮ হাজারের বেশি সেনাসদস্যের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নেই। প্রকল্পটি পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে।
তিনি জানান, পাহাড় কেটে সমতল না করে বিদ্যমান ভূপ্রকৃতি অক্ষুণ্ন রেখে ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জমির স্বাভাবিক উচ্চতা বিবেচনায় রেখে ভবনের নকশা করতে হবে।
প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ক্লাস্টার পদ্ধতি
সভায় ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও নয়টি প্রকল্পের বিষয়েও একনেককে অবহিত করা হয়, যেগুলো এরই মধ্যে পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন করেছেন।
দুটি প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, একই ধরনের প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পরিকল্পনা কমিশন বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
গত ১৮০ দিনে সরকার বিচ্ছিন্ন প্রকল্পনির্ভর পদ্ধতি থেকে সরে এসে কর্মসূচিভিত্তিক ক্লাস্টার পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। একই ধরনের প্রকল্পগুলোকে একটি অভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আনার মাধ্যমে প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি ও ঘাটতি শনাক্ত করা হবে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন ইতোমধ্যে ৪১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করেছে। অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সংশোধিত পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে।
প্রকল্পে সময়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয়সীমা নিয়ন্ত্রণেও সরকার কাজ করছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রকল্পের ধারণাপত্র তৈরি থেকে শুরু করে ডিপিপি প্রণয়ন, অনুমোদন ও কার্যাদেশ জারি পর্যন্ত দেড় থেকে চার বছর সময় লেগে যায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি সংশোধিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ ছাড়া একটি প্রকল্প পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এ ব্যবস্থার আওতায় থাকবে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকেও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য, হালনাগাদ ও প্রতিনিধিত্বশীল তথ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও জ্বালানিতে গুরুত্ব
২০৩১ সাল পর্যন্ত দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামোর লক্ষ্য বাংলাদেশকে ভঙ্গুরতা থেকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া। প্রথম দুই বছর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, পরবর্তী তিন বছর উত্তরণ এবং পুরো পাঁচ বছর পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার কাজে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জরুরি জ্বালানির মজুত বাড়াতে সরকার কাজ করছে।
সভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট সচিবরাও বৈঠকে অংশ নেন।