সিলেট জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের অপেক্ষা, সাধারণ সম্পাদক পদে শিপুকে ঘিরে আলোচনা
স্টাফ রিপোর্টার:
দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির অপেক্ষায় থাকা সিলেট জেলা ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। সম্ভাব্য কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও তৃণমূলের একাংশের সমর্থন নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন জেলা ছাত্রদলের বর্তমান সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিলাল উদ্দিন শিপু। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি এ পদের প্রত্যাশী।
শিপুর সমর্থকদের দাবি, স্কুলজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তিনি। তাঁদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া, হামলায় আহত হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তবে নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে কে দায়িত্ব পাবেন, তা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
স্কুলজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে
হিলাল উদ্দিন শিপুর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয় স্কুলজীবনে। সিলেট বিএনপির নেতা অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামানের রাজনৈতিক বলয়ের মাধ্যমে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন।
সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হামলার শিকার হওয়ার দাবি করেন শিপু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষার আগে এক হামলায় তাঁর একটি হাত ভেঙে যায়। আহত অবস্থায় প্লাস্টার করা হাত নিয়েই তিনি পরীক্ষায় অংশ নেন বলে তাঁর সমর্থকেরা জানান।
পরে মদন মোহন কলেজে পড়াশোনার সময়ও ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন তিনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন বলে জানা গেছে। এরপর সিলেট ল’ কলেজে অধ্যয়নকালে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণের উদ্যোগ নেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ সময় ক্যাম্পাসে হামলার মুখে পড়ার কথাও উল্লেখ করেছেন তাঁর সমর্থকেরা।
আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার দাবি
২০১২ সালে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে গঠিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিপু সক্রিয় ছিলেন বলে তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা জানিয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনবিরোধী আন্দোলনসহ পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশ নেন তিনি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণার দিন সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা জানান শিপু। একই বছর খালেদা জিয়ার সিলেট সফরকালে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষের মধ্যে তাঁর বাম পা গুরুতরভাবে জখম হয় বলে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশের পর সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় সিলেটেও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন বলে জানান শিপু। তাঁর দাবি, ওই সময়ে তাঁকে না পেয়ে তাঁর জমজ ভাই, সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন টিপুর ওপর হামলা চালানো হয়। হামলায় টিপু গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ প্রায় ছয়টি মামলা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
শিপুর আরেক ভাই সিলেট জেলা তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এম ইসলাম আলীর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক কারণে ২০টির বেশি মামলা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি এ প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের আন্দোলনেও সক্রিয় থাকার দাবি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় সিলেটে কারফিউ চলাকালে শিপু ও তাঁর সহযোদ্ধারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বলে তাঁর সমর্থকেরা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটের আঘাতেও আহত হন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করে শিপুর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা কর্মসূচি প্রচারে তিনি কাজ করছেন। পাশাপাশি সিলেট-৪ আসনের—জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ—তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক পদে প্রত্যাশা
সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়া এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে বিবেচনায় আসা উচিত। তাঁদের মতে, সাধারণ সম্পাদক পদে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাঁরা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সংগঠনকে আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত করতে পারবেন।
নিজের রাজনৈতিক পথচলা প্রসঙ্গে হিলাল উদ্দিন শিপু বলেন, “আমি কখনো পদের লোভে রাজনীতি করিনি। স্কুলজীবন থেকেই অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান ভাইয়ের নির্দেশনায় শহীদ জিয়ার আদর্শ, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও দেশনায়ক তারেক রহমানের দিকনির্দেশনাকে বুকে ধারণ করে মাঠে আছি। ছাত্রলীগের হামলায় হাত ভেঙে যাওয়া, মাজার এলাকায় পা জখম হওয়া, আমাকে না পেয়ে আমার সাংবাদিক ভাইকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা কিংবা একাধিকবার কারফিউ ভাঙা—কোনো কিছুই আমাকে ও আমার পরিবারকে জাতীয়তাবাদের পথ থেকে সরাতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আমার অতীত ত্যাগ ও শ্রম বিবেচনা করে দায়িত্ব দিলে সিলেট জেলা ছাত্রদলকে মেধা, শৃঙ্খলা ও ত্যাগের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সংগঠনে রূপান্তর করতে কাজ করব।”
এদিকে, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে দলের দায়িত্বশীল পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তবে নতুন কমিটি কবে ঘোষণা করা হবে কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে কে দায়িত্ব পাবেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
শিপুর সমর্থকদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব দেওয়া হবে। এখন সিলেট জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন নেতাকর্মীরা।