জাফলংয়ে খোলা আকাশের নিচে অকেজো ক্রাশার মেশিন
গোয়াইনঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি:
সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ে দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় পাথরভিত্তিক ব্যবসায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। একসময় পাথর ক্রাশিং মেশিনের শব্দে মুখর থাকা ক্রাশার জোনগুলো এখন অনেকটাই নীরব। কোটি কোটি টাকা মূল্যের ক্রাশার মেশিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনের বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরেছে, কোথাও কোথাও লোহার কাঠামোর গায়ে জন্মেছে আগাছা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, জাফলং কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে আমদানি করা পাথর ক্রাশিং করে কোনো রকমে ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন তাঁরা। কিন্তু ক্রাশার মেশিনে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর সেই কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
প্রকাশ্য সংবাদসূত্রে জানা যায়, পরিবেশবিধ্বংসী ও অবৈধ পাথর ব্যবসা বন্ধে ২০২৫ সালের জুনে জাফলংসহ সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ক্রাশার মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযান শুরু করে প্রশাসনের টাস্কফোর্স। জাফলংয়ে প্রথম দফায় ৬৭টি এবং পরবর্তী সময়ে আরও ৭৭টি ও ১৮টি ক্রাশার মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এ অভিযানের প্রেক্ষাপট হিসেবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন ও পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধের কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে সরকারি পর্যায় থেকে জাফলংসহ সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলো ভবিষ্যতে ইজারা না দেওয়ার বিষয়েও বক্তব্য দেওয়া হয়।
নীরব ক্রাশার জোন
সরেজমিন জাফলংয়ের বিভিন্ন ক্রাশার জোন ঘুরে দেখা যায়, একসময় কর্মচঞ্চল এসব এলাকা এখন অনেকটাই নীরব। খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে পাথর ভাঙার কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেক মেশিনের যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও মেশিনের লোহার কাঠামো ঘিরে আগাছা জন্মেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, মেশিন বন্ধ থাকলেও সাইটের ভাড়া, পাহারাদার ও কর্মচারীদের ন্যূনতম খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে লোকসানের বোঝা আরও বাড়ছে। পাশাপাশি তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে বৈধভাবে আমদানি করা পাথর ক্রাশিং করতে না পারায় আমদানি করা পাথরের ব্যবহার ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও সংকট তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
কর্মহীন শ্রমিকরা
ক্রাশার মিলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। মেশিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
শ্রমিক রহমান মিয়া বলেন, “কোয়ারি বন্ধ হওয়ার পর ক্রাশার মিলে পাথর টেনে কোনোমতে সংসার চালাতাম। দুই বছর ধরে ক্রাশার মেশিন বন্ধ। এখন দিনে একবেলা খাই, দুই বেলা উপোস থাকি। ধারদেনা করতে করতে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।”
নারী শ্রমিক মরিয়ম বিবি বলেন, ক্রাশার মেশিন বন্ধ হওয়ার পর তাঁদের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে গেছে। কাজ না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি জানান।
ঋণের চাপে ব্যবসায়ীরা
ব্যবসায়ীদের অবস্থাও নাজুক। ব্যাংক ও স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে যারা ক্রাশার মিল স্থাপন করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘদিন মেশিন বন্ধ থাকায় বিনিয়োগকৃত বিপুল অর্থ আটকে আছে। ঋণের চাপ সামলাতে কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে লাখ লাখ টাকা মূল্যের যন্ত্রাংশ ও লোহার সামগ্রী নামমাত্র দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজস্ব ও পাথর ব্যবসায় প্রভাব
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আমদানি করা পাথর ক্রাশিং বন্ধ থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে রাজস্ব ক্ষতির নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কোনো তথ্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান হলো—পরিবেশ রক্ষা এবং অবৈধ পাথর উত্তোলন ও ব্যবসা বন্ধে ক্রাশার মেশিনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। ২০২৫ সালের অভিযানে প্রশাসন, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি ও বন বিভাগের সমন্বিত টাস্কফোর্স অংশ নেয়।
ফলে জাফলংয়ের পাথরনির্ভর অর্থনীতিতে পরিবেশ সংরক্ষণ, বৈধ আমদানি করা পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্যবসায়ী-শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়গুলো কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এখন সেটিই স্থানীয়দের অন্যতম বড় প্রশ্ন।