logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
লেখালেখি ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৪ অপরাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

জৈন্তিয়ার রাজকীয় সীলমোহরে লম্ফমান সিংহ, পতাকায় ছিল সোনালি মাছ!

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৪ অপরাহ্ন লেখালেখি
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫৪ অপরাহ্ন
জৈন্তিয়ার রাজকীয় সীলমোহরে লম্ফমান সিংহ, পতাকায় ছিল সোনালি মাছ!

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জৈন্তিয়া রাজ্যের সরকারি দলিলপত্রে ব্যবহৃত রাজকীয় সীলমোহর ও পতাকা ছিল রাজ্যের ঐতিহ্য, শাসনব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। রাজাদের চিঠিপত্র, বিভিন্ন চুক্তিপত্র এবং ভূমিদানের দলিল বা তাম্রফলকে ব্যবহৃত সীলমোহরের মাধ্যমে জৈন্তিয়ার রাজকীয় প্রতীকের পরিচয় পাওয়া গেলেও পতাকার প্রকৃত রূপ নিয়ে ইতিহাসে রয়েছে কিছুটা মতভিন্নতা।


গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের তথ্যমতে, জৈন্তিয়ার রাজাদের হাতে লেখা বিভিন্ন দলিল এবং ঐতিহাসিকদের হাতে আসা তাম্রফলকগুলোতে একটি নির্দিষ্ট রাজকীয় প্রতীকের ব্যবহার দেখা যায়। সেই প্রতীকে একগুচ্ছ শাপলার ওপর লম্ফমান একটি সিংহের চিত্র রয়েছে।


সীলমোহরে লম্ফমান সিংহ ও শাপলা


জৈন্তিয়া রাজ্যের বিভিন্ন তাম্রফলকে ব্যবহৃত রাজকীয় সীলমোহর প্রায় একই ধরনের। কোথাও সিংহটি বামদিকে মুখ করে রয়েছে, আবার কোনো কোনো তাম্রফলকে তার মুখ ডানদিকে ঘোরানো।


সিংহটির নিচে প্রায় সব তাম্রফলকেই দেখা যায় একগুচ্ছ ভাসমান শাপলা। লম্ফমান সিংহ ও শাপলার এই চিত্রটি সাধারণত পরপর তিনটি বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকত। এর মধ্যবর্তী বৃত্তটি ছিল বিন্দুর বৃত্ত এবং বাইরের দুটি ছিল সাধারণ রৈখিক বৃত্ত।


তবে সব তাম্রফলকে একই নকশা দেখা যায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনটি বৃত্তই বিন্দুর বৃত্ত এবং আবার কোনো কোনো তাম্রফলকে সিংহ ও শাপলার প্রতীককে মাত্র একটি বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়।


তাম্রফলকগুলোতে ব্যবহৃত এসব বৃত্তের আকারও প্রায় অভিন্ন ছিল। প্রতিটি বৃত্তের ব্যাস ছিল আনুমানিক ১.৮৭৫ ইঞ্চি।


রাজকীয় প্রতীক নিশ্চিত, পতাকা নিয়ে মতভিন্নতা


জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজকীয় সীলমোহর সম্পর্কে ঐতিহাসিক দলিল থেকে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেলেও রাজ্যের পতাকা দেখতে কেমন ছিল, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো মূল দলিল বা নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়নি।


জৈন্তিয়া সমতলের কিছু গবেষকের মতে, রাজ্যের পতাকায় সিংহের প্রতীক ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে জৈন্তিয়া পাহাড়ের গবেষকদের বক্তব্য, পতাকায় ছিল মাছের প্রতীক।


গবেষক আসিফ আযহারের মতে, সময়ের সঙ্গে রাজ্যের পতাকার নকশা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। একইভাবে পাহাড় ও সমতল অঞ্চলে একই পতাকা ব্যবহৃত হতো কি না, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।


পাহাড়ি প্রবীণদের স্মৃতিতে তিন রঙের পতাকা


জৈন্তিয়ার পতাকার বিষয়ে পাহাড়ি প্রবীণদের কাছ থেকে প্রচলিত বর্ণনাকে প্রথমবারের মতো লিখিতভাবে সংরক্ষণ করেছেন জোয়াই শহরের কিয়াং নাংবাহ সরকারি কলেজের প্রাক্তন ইংরেজি শিক্ষিকা কং ফিরিও পাসলেইন (Kong Phirio Paslein)।


এছাড়া The Jaintia Kings: Information Visualization of Jaintia History and Culture শিরোনামের একটি গবেষণা প্রকল্পের প্রতিবেদনেও জৈন্তিয়ার পতাকার একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। অধ্যাপক রবি পুভাইয়ার (Prof. Ravi Poovaiah)-এর তত্ত্বাবধানে প্রতিবেদনটি রচনা করেন জোনাথন সাওইয়ান (Jonathan Sawian)।


তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার আগে জৈন্তিয়া রাজ্যের নিজস্ব পতাকা ছিল তিনটি উল্লম্ব রঙের সমন্বয়ে তৈরি। পতাকার বাম পাশে ছিল সবুজ, মাঝখানে আকাশী এবং ডান পাশে লাল রং। তিনটি অংশই ছিল সমান আকারের।


তিন রঙে প্রতিফলিত হয়েছিল জৈন্তিয়ার সমাজ


প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, পতাকার প্রতিটি রঙের আলাদা প্রতীকী অর্থ ছিল।


সবুজ রং ছিল কৃষি এবং সমতলের মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রতীক।


আকাশী রং প্রতীকীভাবে নির্দেশ করত সত্য, সততা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসকে।


আর লাল রং ছিল রাজ্যের সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর প্রতীক।


পতাকার মাঝখানে ছিল ডানদিকে মুখ করা একটি সোনালি মাছের প্রতীক। এই মাছকে জৈন্তিয়ার রাজাদের আদি শিকড়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো।


রাজবংশের শিকড়ের প্রতীক মাছ


সুতংগা পুঞ্জির কিংবদন্তি অনুযায়ী, জৈন্তিয়ার রাজাদের আদি মাতা মাছের রূপ ধারণ করেছিলেন। সেই কিংবদন্তির প্রতিফলন হিসেবেই পতাকায় সোনালি মাছের প্রতীক ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।


জোনাথন সাওইয়ান ঐতিহাসিক বর্ণনার ভিত্তিতে জৈন্তিয়া রাজ্যের পতাকার একটি নমুনাও প্রস্তুত করেছেন। বর্তমানে সেই নমুনাটি ভারতের শিলং শহরের ডন বস্কো জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।


জৈন্তিয়ার রাজকীয় সীলমোহর ও পতাকার ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন এই রাজ্য শুধু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকেই স্বতন্ত্র ছিল না; বরং নিজস্ব প্রতীক, রং, কিংবদন্তি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মাধ্যমেও একটি সুস্পষ্ট রাজকীয় ঐতিহ্য ধারণ করেছিল।


তথ্যসূত্র: গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের গবেষণালব্ধ তথ্য।


চিত্র:

১. জৈন্তিয়া রাজ্যের পতাকা

২. জৈন্তিয়া রাজ্যের একটি তাম্রলিপি, যাতে রাজকীয় সীলমোহরের ছাপ রয়েছে

৩. জৈন্তিয়ার রাজকীয় প্রতীক বা সীলমোহর

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/16856
Page of