জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ছিল রাজদপ্তর, বড়দেউল ছিল রাজকোষ—জৈন্তিয়ার হারানো ইতিহাসের নতুন পাঠ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জৈন্তাপুর
সিলেটের জৈন্তাপুরে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলো শুধু ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক শত বছরের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজকীয় জীবনযাত্রার ইতিহাস। এসব স্থাপনার মধ্যে ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’ ও ‘বড়দেউল’ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ধারণায় জৈন্তেশ্বরী বাড়িকে মন্দির এবং বড়দেউলকে বড় মন্দির হিসেবে দেখা হলেও গবেষক ও লেখক আসিফ আযহার তাঁর ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ে স্থাপনা দুটির ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তাঁর গবেষণা ও স্থানীয় জনশ্রুতির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ছিল মূলত জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রধান রাজদপ্তর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র, আর বড়দেউল ছিল মূলত রাজকোষ বা মুদ্রাভাণ্ডার।
জৈন্তেশ্বরী বাড়ির প্রকৃত নির্মাণকাল ও নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো তাম্রলিপি, শিলালিপি কিংবা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকদের বর্ণনা, স্থানীয় প্রবীণদের বক্তব্য ও প্রচলিত জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে আসিফ আযহার মনে করেন, স্থাপনাটি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে জৈন্তেশ্বরী বাড়ি জৈন্তাপুরের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে উঁচু দেয়ালঘেরা প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো ‘বলির পাঠাতনে’
গবেষক আসিফ আযহারের বর্ণনায়, জৈন্তিয়া রাজ্যের বিচারব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর। ছোটখাটো অপরাধের জন্য জরিমানা ও বেত্রাঘাতের মতো শাস্তি থাকলেও গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। বিশেষ করে সমতলের হাওরাঞ্চলে ডাকাতির মতো অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
জৈন্তিয়া রাজ্যের বড় অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অন্যতম স্থান ছিল জৈন্তেশ্বরী বাড়ি। বাড়িটির মাঝামাঝি স্থানে বেলেপাথরে নির্মিত একটি গোলাকার বেদি রয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘বলির পাঠাতন’ নামে পরিচিত। গবেষকের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মাথা একটি বিশেষ কাঠামোর ওপর রেখে সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। সেই কাঠামো বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
জৈন্তেশ্বরী বাড়িতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। আসিফ আযহার মনে করেন, এসব জনশ্রুতির বড় একটি অংশ সময়ের সঙ্গে অতিরঞ্জিত হয়েছে এবং অনেক কথাই ঐতিহাসিকভাবে যাচাইযোগ্য নয়।
জৈন্তেশ্বরী বাড়ি কি মন্দির ছিল?
জৈন্তেশ্বরী বাড়ি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে এর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে। কেউ কেউ এটিকে জয়ন্তেশ্বরী দেবীর মন্দির বা পীঠস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আসিফ আযহারের গবেষণা অনুযায়ী, পুরো স্থাপনাটি কোনো মন্দির ছিল না। বরং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনার পাশাপাশি এর ভেতরে একটি সাধারণ মন্দির ছিল বলে ধারণা করা হয়।
‘জয়ন্তেশ্বরী’ নামের সঙ্গে বাড়িটির সম্পর্কের ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। তাঁর মতে, জৈন্তিয়ার সিন্টেং রাজা যশোমাণিক (১৬০৫–১৬৪১) কোচবিহার থেকে জয়ন্তেশ্বরী দেবীর একটি ধাতব মূর্তি উপহার পেয়েছিলেন। সেই মূর্তি বাড়িটির ভেতরে স্থাপন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। মূর্তির কারণেই স্থাপনাটি পরবর্তীতে ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’ নামে পরিচিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে নরতিয়াংয়ের জয়ন্তী বা জয়ন্তেশ্বরী দেবীর সঙ্গে জৈন্তেশ্বরী বাড়িকে এক করে দেখার বিষয়ে লেখক ভিন্নমত পোষণ করেছেন। নরতিয়াংয়ের দেবী মন্দিরকে ঐতিহাসিকভাবে জৈন্তিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সেখানে দেবীকে ‘জয়ন্তী’ নামে অভিহিত করা হয়।
১৭০৮ সালের যুদ্ধের পর মূর্তি চলে যায় নরতিয়াংয়ে
আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭০৮ সালের জৈন্তিয়া-আহোম যুদ্ধের সময় আহোম সৈন্যরা জৈন্তেশ্বরী বাড়ির ধাতব মূর্তিটি গড়গাঁওয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। জৈন্তিয়া পাহাড় অতিক্রমের পথে প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা মূর্তিটি ফেলে চলে যায়। পরে প্রতিরোধ যোদ্ধারা মূর্তিটি নরতিয়াংয়ে নিয়ে গিয়ে সেখানকার মন্দিরে স্থাপন করেন।
এরপর জৈন্তেশ্বরী বাড়ি থেকে মূল মূর্তি চলে গেলেও বাড়িটির প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। লেখকের ধারণা, কর্মরত রাজকর্মচারীদের উপাসনার সুবিধার জন্য সেখানে অন্য কোনো মূর্তি স্থাপন করে ধর্মীয় কার্যক্রম চালু রাখা হয়ে থাকতে পারে।
নরতিয়াংয়ের মন্দিরটি যে জৈন্তিয়া রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল, সে বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রেও উল্লেখ রয়েছে। জৈন্তিয়া রাজা যশোমাণিকের সময় নরতিয়াংয়ের ধর্মীয় গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
রাজস্ব দপ্তরও ছিল জৈন্তেশ্বরী বাড়িতে
গবেষক আসিফ আযহারের মতে, জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজদপ্তর। এর উত্তর পাশে ছিল রাজ্যের প্রধান রাজস্ব দপ্তর। রাজস্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ এখান থেকেই পরিচালিত হতো বলে তিনি ধারণা করেছেন।
রাজস্ব দপ্তরের কয়েক হাত উঁচু ভিটা এখনও টিকে আছে। ভিটার দক্ষিণ পাশে একটি ঘর রয়েছে। ঘরটি নতুন হলেও এর ভিটা রাজাদের আমলের বলে ধারণা করা হয়। সেই ভিটায় রয়েছে ফুল ও লতাপাতার নকশা করা একটি মঞ্চসদৃশ বেদি।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় রাজা এই বেদির সামনে বা ওপর বসতেন। রাজার সংকেত পাওয়ার পর জল্লাদ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত এবং উপস্থিত লোকজন সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করত।
উঁচু দেয়ালের পেছনে ছিল নিরাপত্তার কারণ
জৈন্তেশ্বরী বাড়ির চারপাশে নির্মিত সুউচ্চ দেয়ালও স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আসিফ আযহারের মতে, এসব দেয়াল শুধু স্থাপনার সৌন্দর্যের জন্য নির্মাণ করা হয়নি। রাজদপ্তরের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে অপরাধীদের অস্থায়ীভাবে আটক রাখার উদ্দেশ্যেও এগুলো ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
স্থানীয়ভাবে এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে যে, জৈন্তিয়ার শেষ রাজা ইন্দ্র সিংহের সময় একজন মন্ত্রীকে এখানে বন্দী রাখা হয়েছিল।
হাতির জন্য তৈরি হয়েছিল সুউচ্চ ফটক?
জৈন্তেশ্বরী বাড়ির সবচেয়ে বিস্ময়কর নিদর্শনগুলোর একটি এর সুউচ্চ প্রধান ফটক। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ফটকটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর একটি পাশের স্তম্ভ প্রায় অক্ষত এবং অন্য পাশের স্তম্ভের একটি অংশ এখনও টিকে আছে।
আসিফ আযহারের গবেষণায় ফটকের উচ্চতার একটি বিশেষ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ফটকটি এত উঁচু হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল হাতি। জৈন্তিয়া রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে হাতির ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাজপ্রতিনিধি ও রাজকর্মচারীরা হাতির পিঠে চড়ে রাজধানীতে আসতেন এবং হাতির পিঠে বসেই রাজদপ্তরে প্রবেশ করতেন। ফলে হাতি ও আরোহীর সম্মিলিত উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ফটকটি নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে।
জৈন্তিয়ার প্রাচীন স্থাপনাগুলোর স্থাপত্যে হাতি ও ঘোড়ার উপস্থিতির বিষয়টিও গবেষক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।
দেয়ালে আঁকা ছিল হাতি, ঘোড়া ও বন্যপ্রাণীর চিত্র
জৈন্তেশ্বরী বাড়ির সামনের দেয়ালে থাকা কিছু চিত্রকর্মে তৎকালীন রাজাদের শিল্পরুচির পরিচয় পাওয়া যায় বলে আসিফ আযহার উল্লেখ করেছেন।
একটি চিত্রে কয়েকজন মানুষকে হাতি পোষ মানানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। অন্য একটি দৃশ্যে হাতির সঙ্গে বাঘের লড়াই এবং আরেকটিতে পোষ মানা হাতির পিঠে মাহুতদের দেখা যায়। দেয়ালের চিত্রকর্মে পোষা ও মুক্ত ঘোড়ার উপস্থিতিও রয়েছে।
কে নির্মাণ করেছিলেন জৈন্তেশ্বরী বাড়ি?
এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। লেখকের মতে, রাজা যশোমাণিক হয়তো বাড়িটির মূল অংশ নির্মাণ করেছিলেন। আবার এমনও হতে পারে যে, যশোমাণিক প্রথমে এখানে একটি মন্দির নির্মাণ করে জয়ন্তেশ্বরী দেবীর মূর্তি স্থাপন করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে রাজা লক্ষ্মীনারায়ণের আমলে মন্দিরসহ পুরো এলাকাটি দেয়াল দিয়ে ঘিরে সেখানে রাজ্যের প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়।
অর্থাৎ বর্তমান জৈন্তেশ্বরী বাড়ি একটি নির্দিষ্ট সময়ে একবারে নির্মিত না হয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থাপনা যুক্ত হয়ে একটি বড় রাজকীয় কমপ্লেক্সে পরিণত হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও গবেষণায় উঠে এসেছে।
বড়দেউল: মন্দির নয়, রাজ্যের গোপন রাজকোষ?
জৈন্তেশ্বরী বাড়ির পাশাপাশি জৈন্তিয়া রাজধানীর আরেক রহস্যময় স্থাপনা হলো ‘বড়দেউল’। নামের অর্থ বড় মন্দির হলেও ধ্বংসাবশেষের স্থাপত্য দেখে আসিফ আযহার এটিকে সাধারণ মন্দিরের পরিবর্তে দুর্গসদৃশ একটি স্থাপনা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন।
বড়দেউলের দেয়াল অত্যন্ত পুরু এবং ধ্বংসাবশেষের উচ্চতাও উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, স্থাপনাটি একসময় সাততলা সমান উঁচু ছিল। তবে লেখকের মতে, সে সময়ের নির্মাণপ্রযুক্তি বিবেচনায় পুরো ভবনটি সাততলা হওয়া সম্ভবত বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর ধারণা, মূল ভবন হয়তো চারতলার সমান উঁচু ছিল এবং তার ওপর মিনারের মতো আরও কয়েক স্তরের বর্ধিত অংশ ছিল।
সুড়ঙ্গের রহস্য
বড়দেউলকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আরও একটি জনশ্রুতি রয়েছে—স্থাপনাটির সঙ্গে গোপন সুড়ঙ্গপথ যুক্ত ছিল। স্থানীয়দের দাবি, এই সুড়ঙ্গের একটি অংশ বড়গাং পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং একসময় সেখানে এর মুখও দেখা যেত।
আসিফ আযহারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মন্দিরে প্রবেশের জন্য এমন সুড়ঙ্গপথের প্রয়োজন ছিল না। বরং যুদ্ধ বা রাজধানী দখলের পরিস্থিতিতে রাজকোষের মুদ্রা ও মূল্যবান সম্পদ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এ ধরনের গোপন পথ রাখা হয়ে থাকতে পারে।
এই কারণেই তাঁর ধারণা, বড়দেউল মূলত ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজকোষ বা মুদ্রাভাণ্ডার।
তবে এ ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত প্রত্নতাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং স্থাপনার গঠন, জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণামূলক অনুমান হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
১৭৭৪ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে ধনরত্ন রক্ষা
আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ বাহিনী জৈন্তিয়ার রাজধানী দখল করলেও রাজা ছত্রসিংহ এর আগেই বড়দেউলের মুদ্রা ও ধনরত্ন জৈন্তিয়া পাহাড়ে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে ব্রিটিশরা রাজধানীতে প্রবেশ করে প্রত্যাশিত রাজকোষের সন্ধান পায়নি।
ঐতিহাসিক সূত্রে ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর জৈন্তিয়ায় সামরিক অভিযান এবং রাজা ছত্রসিংহের সঙ্গে সংঘাতের তথ্য পাওয়া যায়।
তবে ব্রিটিশরা দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গিয়ে ব্যয়ভার বহন করছিল। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত রাজার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ১৫ হাজার মুদ্রার বিনিময়ে তারা জৈন্তিয়া ত্যাগ করে।
১৮৩৫ সালে পতনের পর ব্রিটিশদের হাতে যায় রাজসম্পদ
পরবর্তী সময়ে জৈন্তিয়া আর সেই সম্পদ রক্ষা করতে পারেনি। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশরা জৈন্তিয়া দখল করলে রাজবাড়ি ও বড়দেউলের অবশিষ্ট ধনসম্পদ তাদের হাতে চলে যায়। ঐতিহাসিক গবেষণাতেও ১৮৩৫ সালে জৈন্তিয়ার সমতল অঞ্চল ব্রিটিশদের দখলে যাওয়ার বিষয়টি নথিবদ্ধ হয়েছে।
আসিফ আযহারের বর্ণনা অনুযায়ী, বড়দেউলে তখন শুধু একটি ধাতব ঘণ্টা অবশিষ্ট ছিল। ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত সেই ঘণ্টা বাজানোর প্রচলন ছিল। কিন্তু ওই বছরের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বড়দেউলের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। ঘণ্টাটি এবং কিছু ছোট মূর্তি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। এরপর থেকে স্থাপনাটির ধ্বংসাবশেষ একই অবস্থায় পড়ে আছে।
ইতিহাসের নীরব সাক্ষী জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ও বড়দেউল
জৈন্তাপুরের এসব স্থাপনা নিয়ে আজও বহু প্রশ্নের উত্তর অজানা। কোন রাজা কখন এগুলো নির্মাণ করেছিলেন, কোন অংশ কোন সময়ে যুক্ত হয়েছিল, বড়দেউলের প্রকৃত ব্যবহার কী ছিল কিংবা সুড়ঙ্গপথ আদৌ ছিল কি না—এসব বিষয়ে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ও বড়দেউলকে শুধু মন্দির বা ধ্বংসাবশেষ হিসেবে দেখলে জৈন্তিয়ার ইতিহাসের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে। কারণ এসব স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজ্যের প্রশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা, রাজকোষ, ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং রাজকীয় স্থাপত্যের ইতিহাস।
সিলেটের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে অতীতেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জৈন্তাপুর প্রশাসন বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনায় তথ্যফলক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল, কারণ এসব নিদর্শনের ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন।
গবেষক আসিফ আযহারের ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায় সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে স্থাপনার অবশেষ, স্থানীয় স্মৃতি, জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে নতুনভাবে দেখার একটি প্রচেষ্টা। তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ছিল রাজ্যের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র, আর বড়দেউল ছিল সম্ভাব্য রাজকোষ; আজকের ধ্বংসাবশেষের নিচে তাই লুকিয়ে আছে জৈন্তিয়া রাজ্যের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক বিস্মৃত অধ্যায়।
গ্রন্থ: জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন
অধ্যায়: ষষ্ঠ — জৈন্তিয়ার রাজদপ্তর ও রাজকোষ
লেখক: আসিফ আযহার