logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
লেখালেখি ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:১৫ পূর্বাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

জৈন্তিয়ার ইতিহাসে অনুল্লেখিত সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির, রয়ে গেছে রহস্যময় কাহিনি

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:১৫ পূর্বাহ্ন লেখালেখি
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:১৫ পূর্বাহ্ন
জৈন্তিয়ার ইতিহাসে অনুল্লেখিত সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির, রয়ে গেছে রহস্যময় কাহিনি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জৈন্তাপুর

জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু প্রাচীন স্থাপনা আজও মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। এসব স্থাপনার অনেকগুলোর ইতিহাস ঐতিহাসিক গ্রন্থে স্থান পেলেও কিছু নিদর্শন রয়ে গেছে ইতিহাসের মূলধারার বর্ণনার বাইরে। তেমনই একটি প্রাচীন স্থাপনা হলো ‘সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির’। জৈন্তিয়া রাজ্যের এই মন্দিরটির কথা এখন পর্যন্ত কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনায় পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেছেন গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহার।


গবেষক আসিফ আযহারের ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থের ২২তম অধ্যায় ‘সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির’-এ মন্দিরটির অবস্থান, স্থানীয় জনশ্রুতি এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বিস্ময়কর কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।


মন্দিরটির অবস্থান জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী থেকে বেশ দূরে। বর্তমান সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চারিকাটা ইউনিয়নের ভিত্রিখেল গ্রামের বাঘের খেড় এলাকায় এর অবস্থান। আয়তনে বড় এই গ্রামের এক পাশ দিয়ে চতুলবাজার-লালাখাল সড়ক চলে গেছে। সড়কের পশ্চিম পাশে মূল গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করলে একটি পাহাড়ের নিচে পাশাপাশি থাকা এক জোড়া পুরাতন মন্দিরের দেখা মেলে। স্থানীয়দের কাছে স্থাপনাটি ‘সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির’ নামে পরিচিত।


গবেষকের বর্ণনা অনুযায়ী, সুদূর অতীতে সতনাথ ছিলেন ভিত্রিখেল গ্রামেরই একজন সন্ন্যাসী। তাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে বেশ কিছু বিস্ময়কর গল্প প্রচলিত রয়েছে। মন্দিরটির ইতিহাসের অন্য কোনো লিখিত সূত্র না থাকায় এসব জনশ্রুতিই এর অতীত সম্পর্কে জানার প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।


রাজা রামসিংহের সঙ্গে সতনাথের সাক্ষাৎ


প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একদিন সন্ন্যাসী সতনাথ জৈন্তিয়ার রাজা রামসিংহের সঙ্গে দেখা করতে জয়ন্তীপুরের রাজবাড়িতে যান। কিন্তু সে সময় রাজা অন্দরমহলে ব্যস্ত ছিলেন। রাজবাড়ির এক ব্যক্তি সতনাথকে বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, রাজা আসলে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত নন; তিনি হাতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছেন।


সতনাথের এ কথা শুনে ওই ব্যক্তি বিষয়টি রাজাকে জানান। এতে রাজা রামসিংহ বিস্মিত হন। কারণ, সে সময় তিনি সত্যিই হাতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন বলে জনশ্রুতিতে উল্লেখ রয়েছে।


সতনাথের এই বিশেষ ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে রাজা তাকে রাজবাড়ির ভেতরে ডেকে নেন এবং আপ্যায়ন করেন। এরপর কৌশলে আবারও সন্ন্যাসীর বিশেষ ক্ষমতা যাচাই করার চেষ্টা করেন রাজা।


রাজবাড়ির কর্মচারীরা সতনাথের সামনে কয়েকটি কাঠাল রাখেন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একটি কাঠাল ছাড়া অন্য কাঠালগুলোর ভেতরে কোনো কোষ ছিল না। কিন্তু সতনাথ কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই অনেকগুলো কাঠালের মধ্য থেকে সঠিক কাঠালটি তুলে নেন এবং সেখান থেকে কোষ বের করে আনেন।


দুবার সতনাথের বিশেষ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়ার পর রাজা রামসিংহ তার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এর পরদিনই রাজা ভিত্রিখেল গ্রামে এসে সতনাথের জন্য একটি মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। সেই মন্দিরই বর্তমানে স্থানীয়ভাবে ‘সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির’ নামে পরিচিত।


ইতিহাসের আড়ালে প্রাচীন নিদর্শন


সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব ঘটনা মূলত স্থানীয় জনশ্রুতিনির্ভর। মন্দিরটি কখন নির্মিত হয়েছিল, এর নির্মাণশৈলী কী ছিল কিংবা রাজা রামসিংহের সময়ের কোন নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে এর নির্মাণের যোগসূত্র ছিল—এসব বিষয়ে কোনো লিখিত ঐতিহাসিক দলিলের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।


তবে প্রাচীন স্থাপনাটির অস্তিত্ব জৈন্তিয়া অঞ্চলের বিস্তৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইতিহাসের আনুষ্ঠানিক বর্ণনায় স্থান না পেলেও স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, প্রচলিত কাহিনি ও স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশের মাধ্যমে এর অতীতের একটি ধারণা পাওয়া যায়।


গবেষক আসিফ আযহারের ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থে জৈন্তিয়া রাজ্যের বিভিন্ন অক্ষত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার ইতিহাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি এমন অনেক স্থাপনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলোর ইতিহাস আজও রহস্যে ঢাকা।


চিত্র: সতনাথ সন্ন্যাসীর মন্দির।


লেখক: আসিফ আযহার—গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী; দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে কাজ করছেন।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/17769
Page of