জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন: হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ও প্রত্নঐতিহ্যের খোঁজে আসিফ আযহারের নতুন গ্রন্থ
অনলাইন ও প্রিন্ট সংস্করণ
সিলেটের জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রাচীন স্থাপনা, ধ্বংসাবশেষ, তাম্রলিপি, শিলালিপি, মুদ্রা ও অস্ত্রশস্ত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করে ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ নামে নতুন একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন গবেষক ও লেখক আসিফ আযহার। জৈন্তিয়া রাজ্যের অক্ষত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি গ্রন্থটিতে রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর পরিচয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
বইটির ‘ভূমিকা’ অধ্যায়ে লেখক উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ পরিপ্রেক্ষিত উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বর্ণনায়, জৈন্তিয়া ছিল এ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী রাজ্যগুলোর অন্যতম, যা পাহাড় ও সমতল—দুই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। জৈন্তিয়া রাজ্য ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিভুক্ত হয়েছিল—এ তথ্য ঐতিহাসিক সূত্রেও সমর্থিত।
জৈন্তিয়ার প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে লেখকের অনুসন্ধান
গ্রন্থের ভূমিকায় আসিফ আযহার উল্লেখ করেছেন, জৈন্তিয়ার ইতিহাসের প্রাচীনতম অধ্যায় নিয়ে নানা মত ও জনশ্রুতি রয়েছে। তাঁর গবেষণামূলক আলোচনায় আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০ সালের কিছু আগে পূর্ব মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল ও উত্তর সিলেটের সমতলভূমিকে কেন্দ্র করে জৈন্তিয়া রাজ্যের উদ্ভবের একটি ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
লেখকের বর্ণনায়, খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত জৈন্তিয়া কামরূপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ‘নারী রাজ্য’ বা ‘জয়ন্তী রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পাহাড়ি মাতৃপ্রধান জনগোষ্ঠীর নারী সরদারদের হাতে শাসিত হয়েছে। পরবর্তীতে সমতল অংশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসে এবং সপ্তম শতকে লাউড়, গৌড় ও জৈন্তিয়া নামে পৃথক রাজ্যের উদ্ভব ঘটে।
তবে প্রাচীন জৈন্তিয়ার এই কালপর্বের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য লিখিত দলিল সীমিত। ঐতিহাসিক গবেষণাতেও জৈন্তিয়া রাজ্যের উৎপত্তি ও প্রাথমিক ইতিহাসকে অনেকাংশে অস্পষ্ট বলা হয়েছে।
পাহাড় ও সমতলের পুনর্মিলন
বইটির ভূমিকায় বলা হয়েছে, সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত সমতলের জৈন্তিয়া অঞ্চল দুটি পৃথক রাজবংশের অধীনে শাসিত হয়। পরবর্তীতে প্রায় ১৫০০ সালের দিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শাসন আবার সমতলে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় পাহাড়ি সমাজব্যবস্থায় নারী সরদারের পরিবর্তে পুরুষ সরদারের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তাদের শাসকদের উপাধি ছিল ‘সিয়েম’।
ঐতিহাসিক সূত্রেও প্রায় ১৫০০ সালের দিকে জৈন্তিয়া শাসকদের সংস্কৃত নাম গ্রহণ এবং জৈন্তাপুরকে রাজধানী হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। Banglapedia-র তথ্য অনুযায়ী, তখন পার্বত রায় শাসক ছিলেন এবং জৈন্তাপুর ছিল রাজধানী।
আসিফ আযহারের গ্রন্থে বলা হয়েছে, পাহাড় ও সমতল আবার একই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অধীনে আসার পর জৈন্তিয়া নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ায়। পরবর্তী প্রায় তিন শতক এই ঐক্যবদ্ধ ভূখণ্ডই জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজ্যটি দখল করলে সেই স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে।
আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের দুই ভূখণ্ডে জৈন্তিয়ার স্মৃতি
গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক দেখিয়েছেন, ঐতিহাসিক জৈন্তিয়া রাজ্যের পাহাড় ও সমতল অঞ্চল বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভক্ত। বাংলাদেশের সিলেট জেলার উত্তরাঞ্চল ছিল জৈন্তিয়ার সমতলভূমির অংশ। অন্যদিকে ভারতের মেঘালয়ের বর্তমান পূর্ব জৈন্তিয়া পাহাড় ও পশ্চিম জৈন্তিয়া পাহাড় অঞ্চল ছিল রাজ্যের পার্বত্য অংশ।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট এবং কোম্পানীগঞ্জের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত সমতল অঞ্চলে জৈন্তিয়ার ১৮টি রাজ বা পরগনা ছিল। এগুলো হলো—জয়ন্তাপুরী রাজ, জাফলং, চারিকাটা, ফালজুর, ধরগাম, চতুল, খরিল, পাঁচভাগ, আড়াইখা, চাউরা, মুলাগুল, সাতবাক, বাজেরাজ, পশ্চিমভাগ, বড়দেশ, বাউরভাগ, বর্ণফৌদ ও পিয়াইনগুল।
অন্যদিকে বর্তমান মেঘালয়ের জৈন্তিয়া পাহাড়ে ছিল আরও ১২টি পার্বত্য রাজ বা এলাকা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—Sutnga, Nartiang, Nongtalang বা Natelang, Nangphyllut বা Norpuh, Nongjngi, Nangbah, Lakadong, Shangpung, Mynso, Jowai, Raliang এবং Amwi বা Rambhai।
নিদর্শনের ইতিহাস অনুসন্ধানই বইটির মূল বিষয়
আসিফ আযহারের মতে, কয়েক হাজার বছরের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার দাবিসম্পন্ন জৈন্তিয়া রাজ্যের পাহাড় ও সমতলজুড়ে এখনও বিভিন্ন মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও রাজাদের নির্মিত স্থাপনা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে, কোথাও শুধু ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। আবার কিছু ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান স্থাপনা না থাকলেও স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতির যোগ রয়েছে।
কিন্তু এসব নিদর্শন সম্পর্কে আজও পূর্ণাঙ্গ ও ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় না। লেখকের মতে, এর অন্যতম কারণ জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসের অস্পষ্টতা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের মধ্যে মতপার্থক্য।
এই বাস্তবতা সামনে রেখেই ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থে জৈন্তিয়ার বিভিন্ন অক্ষত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে। স্থাপত্যের পাশাপাশি জৈন্তিয়ার রাজাদের প্রস্তুত করা তাম্রলিপি, শিলালিপি, মুদ্রা ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও আলোচনার সংযোজন রয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়, নিদর্শনকেন্দ্রিক গবেষণা
লেখক নিজেই বইটির ভূমিকায় স্পষ্ট করেছেন, ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ জৈন্তিয়া রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের দলিল নয়। বইটির মূল লক্ষ্য হলো জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শনগুলোকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের বিভিন্ন অজানা ও অস্পষ্ট অধ্যায় অনুসন্ধান করা।
এ কাজে জৈন্তিয়ার ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে ‘জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের সহায়তা নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
গবেষক আসিফ আযহার দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণাকাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সংরক্ষণের আহ্বান
জৈন্তিয়ার প্রাচীন স্থাপনাগুলো শুধু স্থানীয় ইতিহাসের অংশ নয়, এগুলো বৃহত্তর সিলেট ও উত্তর-পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমানে জাফলং রাজবাড়িসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষয়, অবহেলা ও পাথর উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ অবস্থায় এসব নিদর্শনের বৈজ্ঞানিক জরিপ, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, সংরক্ষণ এবং যথাযথভাবে ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে পর্যটন ও শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহার করার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’ গ্রন্থটি সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি অংশ—যেখানে হারিয়ে যেতে বসা স্থাপনা ও প্রত্নচিহ্নের মধ্য দিয়ে জৈন্তিয়া রাজ্যের বিস্মৃত ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বই: জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন
লেখক: আসিফ আযহার
অধ্যায়: ভূমিকা
অনলাইনে বইটি: "Internet Archive-এ ‘জৈন্তিয়ার প্রাচীন নিদর্শন’" (https://reference-url-citation.invalid/8)