ঝাড়ফুঁক না প্রতারণা? জকিগঞ্জে কথিত কবিরাজদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান
আহসান হাবীব লায়েক, জকিগঞ্জ:
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জে ধর্মীয় চিকিৎসা ও ঝাড়ফুঁকের নামে কথিত কিছু কবিরাজের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এলেও সম্প্রতি বারঠাকুরী ইউনিয়নের উত্তরকুল গ্রামের বৃদ্ধা হাসনা বেগমের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
অনুসন্ধানে ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধর্মীয় চিকিৎসার আড়ালে কিছু ব্যক্তি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে পরিবারে বিভক্তি সৃষ্টি, কুসংস্কার ছড়িয়ে দেওয়া, চিকিৎসার নামে অর্থ আদায় এবং মানুষকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
হাসনা বেগমের জামাতা মাওলানা ফুজায়েল আহমদের দাবি, শিশু কন্যার চিকিৎসার সূত্রে কথিত কবিরাজ ফয়সাল আহমদ কামরানের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের পরিচয় হয়। এরপর ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রভাবের মাধ্যমে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করা হয় এবং তাঁর কিশোরী মেয়েকেও দীর্ঘদিন মানসিকভাবে প্রভাবিত করে রাখা হয়েছিল। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। একই দিন তাঁর শাশুড়ি হাসনা বেগম অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাঁর দাবি, স্বাভাবিক মৃত্যুকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে নিহতের মেয়ে নাসিমা বেগম, মাসুমা বেগম, হান্না বেগম এবং ছেলে ফয়জুর রহমানের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, ফুজায়েল আহমদের মেয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁদের বাড়িতে ছিল। তাঁকে নিতে এসে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যেই তাঁদের মা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান। তাঁদের মতে, ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে বের হওয়া উচিত।
অন্যদিকে প্রবাসে থাকা হাসনা বেগমের দুই ছেলে মুহিউস সুন্নাহ ও শরীফ খান কমরু এবং মেয়ে মরিয়ম বেগম বলেন, তাঁদের মা দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁদের ভাষ্য, তিনি স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ঘটনার পর একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এক কিশোরকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, ধর্মীয় চিকিৎসার নামে একাধিক ব্যক্তি নিজ বাড়িতে পৃথক কক্ষ বা আস্তানা তৈরি করে রোগী দেখছেন। কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, চিকিৎসার নামে তাঁদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেলেও সেগুলোর স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক সম্মানের কথা বিবেচনায় নিয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি ও অভিযানের পর এ ধরনের কার্যক্রম কিছুটা কমে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও কথিত কবিরাজদের তৎপরতা বেড়েছে। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের দৃশ্যমান তদারকি আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে ফয়সাল আহমদ কামরান বলেন, "এটি একটি পারিবারিক সমস্যা। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।"
তাঁর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে তাঁকে সামাজিকভাবে বর্জনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তের কোনো লিখিত নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
বারঠাকুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহসিন মর্তুজা চৌধুরী টিপু বলেন, "হাসনা বেগম দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আমার জানামতে তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হবে।"
জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, "প্রাথমিকভাবে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনগত পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" পুলিশের মতে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই বৃদ্ধার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় আলেম-উলামারা বলেন, ইসলামে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বৈধ রুকইয়ার অনুমোদন রয়েছে। তবে কুফরি, তাবিজের নামে প্রতারণা, জিনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানার দাবি কিংবা ধর্মের নামে ব্যবসার কোনো সুযোগ নেই। তাঁরা ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে পরিচালিত প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ধর্মীয় চিকিৎসার আড়ালে পরিচালিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি বাড়িয়ে প্রতারণা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।