গতির মরণনেশা বনাম একটি পরিবারের কান্না: মোটরসাইকেল যখন অভিশাপ
পারভেজ হাসান লাখাই প্রতিনিধি।।
বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে মোটরসাইকেল কেবল একটি বাহন নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক চরম উন্মাদনা আর আভিজাত্যের প্রতীক। রাস্তাঘাটে বের হলেই দেখা যায় বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলা দুই চাকার এই যানটি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি বড্ড করুণ। যে মোটরসাইকেল মধ্যবিত্ত বাবার আদরের সন্তানের কাছে এক রঙিন স্বপ্ন, বিত্তবানের কাছে বিলাসিতার উপকরণ,সেই একই বাহন আজ হাজারো মায়ের বুক খালি করে কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ।
সাম্প্রতিক সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০-৪৫% ঘটে শুধুমাত্র মোটরসাইকেলের কারণে। যার বড় একটি অংশই তরুণ ও কিশোর।বিশেষ করে কিশোর ও তরুণরা ‘স্পিড’ বা গতির নেশায় বুঁদ হয়ে ট্রাফিক আইন তোয়াক্কা না করেই রাস্তায় নামছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অথবা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন। একটি শখের মোটরসাইকেল যখন একটি পরিবারের আজীবনের কান্নায় পরিণত হয়, তখন সেই বিলাসিতার কোনো অর্থ থাকে না।
দুর্ঘটনার সময় মানসম্মত হেলমেট না থাকা এবং অতিরিক্ত গতির কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ১৮ বছরের নিচে বা লাইসেন্সবিহীন সন্তানদের হাতে শখের বশে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া মানেই তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া।
ট্রাফিক আইন অমান্য করে লেন পরিবর্তন এবং ওভারটেকিং করার প্রবণতাই দুর্ঘটনার মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আমাদের বুঝতে হবে, গতির চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। রাস্তা কোনো রেসিং ট্র্যাক নয়। হেলমেট পরা, নির্দিষ্ট গতিসীমা মেনে চলা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে চাবি তুলে না দেওয়ার বিষয়ে পরিবার ও সমাজকে আজ কঠোর হতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির পাশাপাশি চালকদের সচেতনতাই পারে এই অকাল মৃত্যু রোধ করতে। মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের গতি যেন বেশি না হয়। কারণ, আপনার একটু অসতর্কতা কেবল আপনার প্রাণই কেড়ে নেয় না, একটি আস্ত স্বপ্নকেও ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
একটি মোটরসাইকেল কারো স্বপ্ন হতে পারে, কারো যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হতে পারে— কিন্তু তা যেন কখনোই শেষ বিদায়ের কারণ না হয়। সড়ক হোক নিরাপদ, আর আমাদের শখ হোক জীবনমুখী।