এতদিন নির্বাচন চাই বলা দলগুলো এখন ভিন্ন সুরে: জামায়াত আমির
সিলেটে এক সমাবেশে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, যারা এতদিন নির্বাচনের জন্য দাবি তুলে জনগণকে উত্তেজিত করেছিলেন, এখন তারাই ভিন্ন কথা বলা শুরু করেছেন। তাঁর ভাষায়, এ প্রবণতা শুভ লক্ষণ নয়।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে সিলেট নগরীর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ইসলামাপন্থি ও সমমনা আট দলের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, এতদিন যারা নির্বাচন চাইতে চাইতে জনগণকে পাগল করে তুলেছিল, এখন তারা ভিন্ন সুরে কথা বলছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডে জনগণ লাল কার্ড দেখাতে প্রস্তুত-এ ধারণা থেকেই হয়তো এই অবস্থান পরিবর্তন।
গণভোটকে কেন্দ্র করে দলগুলোর অবস্থান পরিবর্তন নিয়েও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, একটি দল প্রথমে গণভোটে রাজি ছিল না। পরে তারাই জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজনের দাবি তুলে সরকারকে বাধ্য করল। অথচ শুরু থেকেই তার মিত্র দলগুলো গণভোট আগেভাগে করার দাবিতে রাস্তায় ছিল।
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই বিএনপির প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন ও দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
রাজনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ আশা করেছিল নতুন রাজনীতি শুরু হবে। কিন্তু একটি দল এখনো পুরোনো ধারায় আটকে আছে। তারা কোনো সংস্কারে রাজি নয়। সনদ বাস্তবায়নেও রাজি নয়। গণভোটেও প্রথমে আপত্তি, পরে চাপের মধ্যে সেদিনেই করতে হবে বলে দাবি।
রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদের ছায়া আবারও ঘনিয়ে আসছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ১৭ বছর ধরে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম ছিল। এখন আরেক দল সেটিকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যারা নতুন জুলুমকারী হয়ে উঠেছে, তাদের শিগগির কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

তিনি বলেন, একদল অপকর্ম করে পালিয়েছে, আরেকদল সেই অপকর্মের দায় নিজের কাঁধে নিয়েছে। কেউ চাঁদাবাজি করে জনগণের ক্ষোভ ডেকে এনেছে, আবার কেউ আরও বেশি শক্তি নিয়ে একই কাজ করছে। একদল দখলদার হয়ে ঘৃণা কুড়িয়েছে, আরেকদল বেপরোয়া দখলদার হিসেবে উঠে এসেছে। বিরোধী নেতা, আলেম–ওলামাকে জেল-নির্যাতন–ফাঁসির যে ধারাবাহিকতা ছিল, তা এখনো বন্ধ হয়নি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর যারা এই বাংলাদেশকে জিম্মি করে রেখেছিল, আজ তারা নিজেরা নিজেদের কাছে নিরাপদ নয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আজ তারা নিজেরা নিজেদের খেয়ে ফেলছে। লক্ষ লক্ষ দলীয় নেতাকর্মী যুগ যুগ ধরে তাদের জীবনকে বিপন্ন করেছে জেলের মধ্যে।’ তিনি ৫দফা দাবির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল, জুলাই- ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান। দেশকে সুন্দর করার জন্য সংস্কার করা হবে। এই গুমকারীদের, খুনিদের, টাকা পাচারকারীদের দৃশ্যমান বিচার হবে এবং পরে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু আজকে আমরা হতোবাক! আমাদের সংস্কারে বাধা। অপরাধীদের দৃশ্যমান বিচারে বাধা দেয়া হচ্ছে। একদল পাগল হয়ে গেছে, নির্বাচনকে পেছানোর জন্যে। যতই শয়তানির পরিকল্পনা করবেন ততোই আপনারা বাংলাদেশের জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন।’

বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়ন-নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে খেলাফতে মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, ‘জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শক্তি বিতাড়িত হওয়ার পরও বিদেশি আধিপত্যবাদী শক্তির বাংলাদেশি কিরণরা আবারও নতুন ফ্যাসিবাদ চাপিয়ে দিতে চাইছে। বাংলার মাটিতে নতুন কোনো ফ্যাসিবাদকে জায়গা দেওয়া হবে না। এই দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতারা রক্ত দিয়েছেন, ফাঁসির কাস্টে উঠেছেন, কিন্তু অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেন নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী নির্বাচন শুধু প্রতীক নির্বাচন নয়, এটি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এক ধরনের গণভোটও। তাই আট দলের নেতাকর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে জনগণকে দলীয় প্রতীকের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’
খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদের সভাপতিত্বে ইসলামী ও সমমনা ৮ দল সিলেট জেলা ও মহানগর নেতৃবৃন্দের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর সৈয়দ মোঃ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শায়খ মাওলানা মামনুল হক, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাদের, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ প্রফেসর মাওলানা মুহাম্দ ইউনুছ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মজিদ আতাহারি, বাংলাদেশ ডেভোলাপমেন্ট পার্টি-বিডিপির সভাপতি এডভোকেট এ.কে.এম আনোয়ারুল হক চান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান।
এছাড়াও সকালে থেকেই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন। সমাবেশের শুরুতে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলে। আট দলের এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, জাগপা, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বিডিপির নেতারা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানের শেষে সকলে দেশ ও জাতীর কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করা হয়।