সিলেট–ছাতক রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ল ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত
শাহীন আহমেদ, ছাতক:
দীর্ঘ চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সিলেট–ছাতক রেলপথে ট্রেন চলাচল। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এ রেলপথ পুনর্বাসনে নেওয়া ২১৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে কাজের অগ্রগতি এখনো প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘২০২২ সালের বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট–ছাতকবাজার সেকশন (মিটারগেজ) পুনর্বাসন’ প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড।
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বর্ধিত মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
চার বছর ধরে বন্ধ রেল যোগাযোগ
সিলেট থেকে সুনামগঞ্জের ছাতকবাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথ একসময় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ছাতকের শিল্পকারখানার পণ্য, চুনাপাথর, বালু, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে রেলপথটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পাশাপাশি স্বল্প খরচে সিলেট যাতায়াতের জন্য এ রেলপথের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন, মাটির বাঁধ, সেতু ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও কাজের ধীরগতিতে স্থানীয়দের দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
কেন পিছিয়ে পড়েছে কাজ?
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ বর্ষা মৌসুমের কারণে মাটি ভরাট এবং রেলপথের বাঁধ নির্মাণের কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। দেড় বছর মেয়াদের প্রকল্পে দুটি বর্ষা মৌসুম পড়ায় নির্মাণকাজের গতি ব্যাহত হয়েছে বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয় রেল সরঞ্জাম ও ভারী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্রসংক্রান্ত জটিলতা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবেও কাজ পিছিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, প্রকল্পের জন্য নতুন করে আরও ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ ও অনুকূল আবহাওয়া নিশ্চিত করা গেলে অবশিষ্ট কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব হবে।
কতটুকু কাজ হয়েছে, বাকি কী?
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ইতোমধ্যে পুরোনো জরাজীর্ণ রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মাটি ভরাট, কালভার্ট নির্মাণ এবং রেলসেতু মেরামতের কাজ চলছে।
তবে এখনো নতুন রেললাইন ও স্লিপার স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের বাঁধ পুনর্নির্মাণ, প্রয়োজনীয় উচ্চতা ও দৃঢ়তা নিশ্চিত করা এবং নতুন মিটারগেজ ট্র্যাক স্থাপনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।
শিল্প-বাণিজ্যে ফিরতে পারে গতি
সিলেট–ছাতক রেলপথ পুনরায় চালু হলে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রেলপথে তুলনামূলক কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হলে ছাতকের শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে সড়কপথের ওপর পরিবহননির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণকাজের নিয়মিত তদারকি, অর্থ ও সরঞ্জামের যথাসময়ে সরবরাহ এবং কাজের অগ্রগতি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এ রেলপথের পুনর্বাসন শুধু অবকাঠামো সংস্কারের বিষয় নয়; এটি ছাতক ও সিলেট অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, শিল্প-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত। ২০২৭ সালের ৩০ জুনের বর্ধিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করে কবে নাগাদ ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হবে, এখন সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।