সংকট কাটছে না হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সড়কে, শুরু সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘট
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি ::
হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার-সিলেট সড়কে বাস চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান হয়নি। বাস আটকে রাখা, ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল থেকে হবিগঞ্জ জেলায় অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। ধর্মঘটের কারণে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।
এর আগে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, মৌলভীবাজারে হবিগঞ্জের তিনটি বাস আটকে রাখা এবং পরিবহন শ্রমিকদের নির্যাতনের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হবিগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার-শেরপুর-সিলেট রুটে বাস ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন তারা। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে মৌলভীবাজারের মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জের বাস চলাচলে বাধা দেওয়ার কারণে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং হবিগঞ্জের বাস আগের নিয়মে চলাচলের সিদ্ধান্ত হয় বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের ১০ মে পূর্ব যোগাযোগ ছাড়াই মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা শেরপুর এলাকায় হবিগঞ্জের বাস আটক করলে নতুন করে বিরোধ দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুন সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে দুই পক্ষের মালিক-শ্রমিক নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আবু মঈন চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে হবিগঞ্জ-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার সড়কে পূর্বের নিয়মে বাস চলাচলের সিদ্ধান্ত হয়। তবে শ্রীমঙ্গলে কোনো স্টপেজ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপরও গত ১১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের এসএমএস মালিক-শ্রমিকরা হবিগঞ্জের ২২টি গাড়ি আটকে রাখেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পরবর্তীতে বিরোধ নিরসনে ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় মহাসচিব সাইফুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির খানসহ হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মালিক-শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ১২ জুনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবিগঞ্জ-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার রুটে বাস চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর মৌলভীবাজার এসএমএস কর্তৃপক্ষ আটক করা গাড়িগুলো ছেড়ে দেয়।
তবে ২৪ সেপ্টেম্বর আবার বাস চলাচল শুরু হলে মৌলভীবাজারের এসএমএস কর্তৃপক্ষ হবিগঞ্জের তিনটি বাস আটক করে বলে অভিযোগ করেন আবু মঈন চৌধুরী। এ ঘটনায় বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ১ অক্টোবর থেকে হবিগঞ্জ জেলায় অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হয়।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, “আমরা চাই আমাদের বাসগুলো যেন পূর্বের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নির্বিঘ্নে চলাচল করে।”
তবে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও এসএমএস বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম রিপন। তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধানের দিকে এগোচ্ছিল। এর মধ্যে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের নেতৃবৃন্দের লোকজন শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এতে কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে একজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বলে জানান তিনি।
আব্দুর রহিম রিপনের ভাষ্য, শ্রীমঙ্গলের শ্রমিকরাই বাসগুলো আটকে রেখেছেন এবং এ ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছে। বিরোধের সমাধানের জন্য উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে বলেও তিনি জানান।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ধর্মঘট শুরু হওয়ায় হবিগঞ্জ থেকে কোনো রুটে বাস ছেড়ে যায়নি। জেলার অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি দূরপাল্লার গণপরিবহনও বন্ধ রয়েছে। ফলে জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষসহ সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
দুই জেলার মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় বারবার বাস চলাচল বন্ধ ও ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের আন্তঃজেলা পরিবহন ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ছে।