২২৭ বছর পর আলোচনায় জৈন্তিয়া রাজ্যের শিলালিপি: ঢুপির মঠের প্রতিষ্ঠার অমূল্য ইতিহাসের সাক্ষী
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে একটি বিরল শিলালিপি। রাজাদের চিঠি, মুদ্রা ও তাম্রফলকের পাশাপাশি এই শিলালিপি এখন জৈন্তিয়া ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০০৭ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে আবিষ্কৃত এই শিলালিপি আজও বহন করছে প্রায় ২২৭ বছর আগের জৈন্তিয়া রাজ্যের ঐতিহাসিক স্মৃতি।
গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের তথ্যমতে, সারীঘাটের নিকটবর্তী ঢুপির পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত রামেশ্বর শিবমন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি বেলগাছের নিচে মাটি খননের সময় শিলালিপিটি উদ্ধার করা হয়। এটি কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক খনন বা পরিকল্পিত অনুসন্ধানের মাধ্যমে নয়, বরং এক আকস্মিক ঘটনার মধ্য দিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছিল।
কীর্তনের রাতে মিলেছিল শিলালিপির সন্ধান
বর্তমান রামেশ্বর শিবমন্দিরটি মূলত একটি স্থানান্তরিত মন্দির। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ নির্মিত প্রাচীন মন্দিরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরে শিবলিঙ্গটি পাহাড়ের নিচে এনে নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়।
২০০৬ সালে নতুন মন্দিরটি পাকা করার পর ২০০৭ সালের ২২ মার্চ তিনদিনব্যাপী অষ্টপ্রহর কীর্তনের সময় প্রবল বৃষ্টিতে মন্দির প্রাঙ্গণে পানি জমে যায়। পানি নিষ্কাশনের জন্য স্থানীয় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক রাতেই একটি নালা খনন শুরু করেন। খননের একপর্যায়ে তারা মাটির নিচে একটি ভারী পাথর খুঁজে পান। প্রথমে সাধারণ পাথর মনে করে সেটি সরিয়ে রাখা হলেও পরদিন সকালে দেখা যায়, পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে একাধিক লিপি।
সংস্কৃত ভাষায় লেখা ছিল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
পাথরটি পরিষ্কার করার পর দেখা যায়, এতে নয়টি তরঙ্গাকৃতির লাইনে খোদাই করা রয়েছে সংস্কৃত ভাষার লেখা। বাংলা ও সিলেটি নাগরী হরফের সংমিশ্রণে লেখা এই লিপিতে স্পষ্টভাবে পড়া যায়—‘নমঃ শিবা’, ‘মন্দির’, ‘স্থাপিত’, ‘শৈলশীর্ষ’, ‘শক ১৭১৯’সহ কয়েকটি শব্দ।
লিপিটি উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি ইতিহাসপ্রেমীদের ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় আলোকচিত্রী ও কলেজ শিক্ষক মো. খায়রুল ইসলাম লিপিটির ছবি ধারণ করেন এবং সাংবাদিক নুরুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করেন।
পরদিন শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সন্তোষ কান্তি ভট্টাচার্য জৈন্তাপুরে গিয়ে শিলালিপিটির পাঠোদ্ধার করেন। তিনি জানান, এটি ঢুপির পাহাড়ের উপরে নির্মিত রামেশ্বর শিবমন্দিরের প্রতিষ্ঠা স্মারক।
কী লেখা ছিল শিলালিপিতে
পাঠোদ্ধার অনুযায়ী, রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ পালের অনুমতিতে পাপমোচনের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের চূড়ায় মনোরম পরিবেশে রামেশ্বর শিবমন্দির নির্মাণ এবং সেখানে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার কথা লিপিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া স্থানটিকে কৈলাসতীর্থের সমতুল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে পাখির কলতানে মুখরিত পরিবেশে নিয়মিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো।
লিপির শেষে উল্লেখ রয়েছে—‘শক ১৭১৯’। শকাব্দের সঙ্গে ৭৮ বছর যোগ করলে খ্রিস্টাব্দ পাওয়া যায়। সে হিসেবে শিলালিপিটি ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে খোদাই করা হয়েছিল।
ইতিহাসের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় তাম্রলিপিতেও
গবেষকদের মতে, ১৭৯৭ সালে রাজা দ্বিতীয় রামসিংহ ঢুপির পাহাড়ের ওপর দৃষ্টিনন্দন রামেশ্বর শিবমন্দির নির্মাণ করেন এবং সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতে এই শিলালিপি খোদাই করান।
এর এক বছর পর, অর্থাৎ ১৭৯৮ সালে খোদাইকৃত একটি তাম্রলিপিতেও একই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ঢুপির পাহাড়কে ‘কপোত পাহাড়’ এবং মন্দিরটিকে ‘রামেশ্বর শিবমন্দির’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘ঢুপির মঠ’ নামেই অধিক পরিচিত ছিল।
সরকারি সংরক্ষণে শিলালিপি
শিলালিপিটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটি তৎকালীন জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাঁর নির্দেশে জৈন্তাপুর থানা প্রায় তিন বছর এটি সংরক্ষণ করে।
পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে শিলালিপিটি সিলেট শহরের ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়। তৎকালীন সিলেটের পুলিশ সুপার মো. সাখাওয়াত হোসেন এটি জাদুঘরের পরিচালক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে দরগাগেইট এলাকার মুসলিম সাহিত্য সংসদের মাহবুব ভবনে অবস্থিত জাদুঘরটিতেই শিলালিপিটি সংরক্ষিত রয়েছে।
শিলালিপির বৈশিষ্ট্য
প্রায় ৩৫ কেজি ওজনের এই পাথরের দৈর্ঘ্য ১৯.২৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১৩.৭৫ ইঞ্চি এবং পুরুত্ব প্রায় ৩ ইঞ্চি। এর চারপাশে ফুল ও পাতার নকশা খোদাই করা রয়েছে। লিপিটি একটি বিশেষ ত্রিভুজাকার তরঙ্গ (Triangle Waveform Script) বিন্যাসে নির্মিত, যেখানে নয়টি তরঙ্গাকৃতির লাইনে মোট ৩৬টি ত্রিভুজের মাধ্যমে লেখাগুলো বিন্যস্ত হয়েছে। এমন নকশায় লিপি খোদাইয়ের কারণ স্পষ্ট না হলেও ধারণা করা হয়, নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল।
ইতিহাস গবেষণায় নতুন দিগন্ত
জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসে এই শিলালিপি একটি অনন্য সংযোজন। রাজাদের চিঠি, মুদ্রা ও তাম্রফলকের পাশাপাশি এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনার প্রতিষ্ঠা স্মারক নয়, বরং অষ্টাদশ শতকের জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস, স্থাপত্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
তথ্যসূত্র: গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহারের গবেষণালব্ধ তথ্য।