logo
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
সিলেট ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৪ অপরাহ্ন চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
বাগান থেকে আন্তর্জাতিক বাজার—একটি ফল ঘিরে হাজারো স্বপ্ন, প্রয়োজন আধুনিক সংরক্ষণ ও রপ্তানি সুবিধা

জৈন্তাপুরের জারা যাচ্ছে বিদেশে, সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে সিলেটের কৃষিতে

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৪ অপরাহ্ন সিলেট
চ্যানেল জৈন্তা নিউজ ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৪ অপরাহ্ন
জৈন্তাপুরের জারা যাচ্ছে বিদেশে, সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে সিলেটের কৃষিতে

সিলেট :

সিলেটের মাটি ও প্রকৃতির এক অনন্য উপহার জারা। আকারে বড়, সুগন্ধে স্বতন্ত্র আর স্বাদে বৈচিত্র্যময় এই ফল একসময় মূলত স্থানীয় মানুষের চাহিদা পূরণ করলেও এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিতি পাচ্ছে। বিশেষ করে জৈন্তাপুরের হরিপুর, চিকনাগুলসহ বিভিন্ন এলাকার বাগানে উৎপাদিত জারা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা।


স্থানীয়ভাবে ‘শাসনী’ নামেও পরিচিত এ ফলের প্রতি প্রবাসীদের আগ্রহ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জারা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে উৎপাদন ও চাহিদার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক সংরক্ষণ, মানসম্মত প্যাকেজিং এবং রপ্তানির উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাব এ খাতের সম্প্রসারণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।


বড় ফল, ভালো দাম


জৈন্তাপুরের হরিপুর ও চিকনাগুল বাজারে মৌসুম এলেই দেখা মেলে নানা আকারের জারার। কোনো কোনো ফলের ওজন দুই থেকে তিন কেজি পর্যন্ত হয়। আকার, মান ও ধরন অনুযায়ী প্রতিটি জারা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।


স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি সিলেট নগরেও রয়েছে এ ফলের ক্রেতা। বিশেষ করে প্রবাসীরা দেশে এলে জারা কেনার প্রতি তাঁদের আগ্রহ দেখা যায়। অনেকেই বিদেশে যাওয়ার সময় স্বজনদের জন্য এ ফল সঙ্গে নিয়ে যান।


স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, জারার চাহিদা কেবল স্বাদের কারণে নয়; সিলেটের ঐতিহ্য ও স্থানীয় কৃষির সঙ্গেও ফলটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে প্রবাসীদের কাছে জারা এক ধরনের স্মৃতি ও শেকড়ের পরিচয় বহন করে।


জৈন্তাপুরের মাটিতে ফলনের সম্ভাবনা


জৈন্তাপুরের হরিপুর, শ্যামপুর, বাগেরখাল, শিকারখাঁ, চিকনাগুল, উমনপুর, পানিছড়া, ঠাকুরের মাটি ও কালিনঞ্জিবাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে জারা চাষ হচ্ছে। গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর ও বানিগ্রাম এলাকাতেও এ ফলের চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে।


সাইট্রাস গবেষণার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, সিলেটে কলস, পানি ও গুটি—এ ধরনের জারা উৎপাদিত হয়। গুটি জারা আকারে বড় হওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য অনুকূল হওয়ায় বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ‘বারি-১’ জাতও এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। উন্নত জাত, উপযুক্ত পরিচর্যা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ও গুণগত মান আরও বাড়ানো সম্ভব।


১২৭ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ১,১৩৭ টন


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিলেট অঞ্চলে ১২৭ হেক্টর জমিতে জারা চাষ করে ১ হাজার ১৩৭ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে অঞ্চলে মোট ২৮১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের লেবু চাষ করে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৫৫৮ মেট্রিক টন।


এ পরিসংখ্যান সিলেট অঞ্চলে জারা চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। পরিকল্পিত বাগান ব্যবস্থাপনা, উন্নত চারা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ ফল স্থানীয় কৃষকদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।


৩৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে রপ্তানির নতুন আশা


জারা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিদেশে পাঠানোর সুযোগ বাড়াতে সিলেটে আধুনিক প্যাকিং হাউস ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা।


প্রস্তাব অনুযায়ী, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে বড়শলা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমিতে এ অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।


সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞ দল প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে পরবর্তী ধাপে নির্মাণকাজ শুরুর সুযোগ তৈরি হবে।


আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ ও প্যাকিং হাউস গড়ে উঠলে ফলের সতেজতা ধরে রাখা, মানসম্মতভাবে প্যাকেটজাত করা এবং রপ্তানির উপযোগী করে বাজারে পাঠানো সহজ হতে পারে। এতে জারা ছাড়াও সিলেটের অন্যান্য কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে।


সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ


সিলেটের জারা শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি স্থানীয় কৃষি, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাময় ব্যবসার অংশ। কিন্তু বিদেশে চাহিদা বাড়লেই রপ্তানি টেকসই হবে না—এর জন্য প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা, উন্নত পরিবহন এবং কৃষক থেকে রপ্তানিকারক পর্যন্ত সমন্বিত বাজারব্যবস্থা।


বিশেষ করে জৈন্তাপুরের উৎপাদকদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাগান সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া এবং সরাসরি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা গেলে এ খাত আরও লাভজনক হতে পারে।


সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে জৈন্তাপুরের বাগানে উৎপাদিত জারা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বিস্তৃত পরিচিতি পেতে পারে। সেই সঙ্গে সিলেটের কৃষি অর্থনীতিতে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ।

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ · https://channeljaintanews24.com/top-news/18253
Page of