গোপন পথে মাদকের সয়লাব: ঝুঁকিতে মৌলভীবাজারের সীমান্ত জনপদ
মৌলভীবাজার জেলার কয়েকটি উপজেলা দিয়ে অবৈধভাবে গোপনে প্রবেশ করে নানান ধরণের মাদক। সীমান্তে দায়িত্বরত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের টহলের সময়ের চোখে পড়লে এসব পণ্য সাথে সাথে জব্দ করা হয়। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এসব মাদকপাচারকারীদের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা একটি জেলা।
জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রায় ২৭১ কিলোমিটার এলাকা ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী। বিস্তীর্ণ এই সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত ভারত থেকে অবৈধভাবে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য ও পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তবে বিজিবিকে ফাঁকি দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য দেশে প্রবেশ করে, তার আর কোনো খোঁজ মেলে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্গম সীমান্ত এলাকা, কাঁটাতারের অভাব ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা সহজে মাদক ও চোরাই পণ্য দেশে নিয়ে আসছে।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এ ধরনের অবৈধ প্রবেশ অনেকাংশে কমে আসবে।
তাদের মতে, বাংলাদেশ অংশে অধিকাংশ এলাকায় নেই কাঁটাতারের বেড়া কিংবা সীমান্তে পৌঁছানোর মতো সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক স্থানে বিজিবি সদস্যদের ক্যাম্প থেকে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাতে দুই থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হয়। এসব এলাকায় রয়েছে ঘন জঙ্গল।
রাতের বেলা কয়েক হাত দূরেও কিছু দেখা যায় না। সীমান্তে কাঁটাতার ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে অবৈধ মাদক ও চোরাইপণ্যের অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর দুই মাসে তারা ১৭২টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে প্রায় ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার পাঁচটি উপজেলা-কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী ও বড়লেখার সঙ্গে ভারতের প্রায় ২৭১ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।
এর মধ্যে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার সীমান্তের দায়িত্বে রয়েছে বিজিবি-৪৬ ব্যাটালিয়ন। জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার দায়িত্বে রয়েছে বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়ন।
এই সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত চোরাই পণ্য, ইয়াবা, মদ, নিষিদ্ধ সিগারেট ও বিড়ি, মহিষ, গোলাবারুদ, কাপড়, মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিশেষ করে রাতের আঁধার ও ভোরবেলায় এসব পণ্য পাচার করা হয়। বিজিবির নজরে পড়লে সেগুলো জব্দ করা হয়, অন্যথায় দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
বিজিবি সূত্র জানায়, বেশির ভাগ এলাকা পাহাড়ি ও জঙ্গলে ঘেরা। ভারতের অংশে কাঁটাতারের বেড়া ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশের অনেক সীমান্ত এলাকা এখনো অবকাঠামোগত সুবিধাবঞ্চিত। নতুন উদ্যোগ নিয়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সড়ক নির্মাণ করা জরুরি। এতে অবৈধভাবে পণ্য প্রবেশ অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমান্তবর্তী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত বিড়ি, সিগারেট, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে আসে। অধিকাংশ সময় রাত ও ভোরে এসব পণ্য পাচার হয়। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবেশী দেশ থেকে প্রতিনিয়ত নেশাজাতীয় মাদক দেশে প্রবেশ করছে, যা যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসইউপি মো. আতাউর রহমান অবৈধভাবে মাদকের গোপন অনুপ্রবেশের কথা স্বীকার করে এ বিষয়ে বলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। যদিও এটি ব্যয়বহুল, তবু সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য এটি জরুরি। সিলেট বিভাগের জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, জুড়ী, বড়লেখা, কুলাউড়াসহ বেশ কয়েকটি সীমান্ত এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।
অনেক সীমান্ত এলাকা এতটা দুর্গম যে ক্যাম্প থেকে সেখানে পৌঁছাতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায় বলে জানান তিনি।