সড়ক প্রকল্পের অনিয়ম তদন্ত ও পাঁচ দফা দাবি বিএনপির, এমপি নুরুলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রতিবাদ
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ-কাছিরগাতি-বিশ্বম্ভরপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজের অনিয়ম তুলে ধরায় সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে দলটি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সুনামগঞ্জে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল হক, সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুক আলম, নাদির আহমদ, আকবর আলী, অ্যাডভোকেট শেরেনুর আলী, রেজাউল হক ও আ.ত.ম. মিসবাহসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজটি পেয়েছিল ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বদরুল ইসলাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মূল ঠিকাদার দেশ ছেড়ে চলে গেলে প্রথমে সাব-ঠিকাদার হিসেবে আজাদ হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে দ্বিতীয় সাব-ঠিকাদার হিসেবে শফিকুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, গত ২৭ অক্টোবর সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল বিশ্বম্ভরপুরের রতারগাঁও হাইস্কুলে একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে স্থানীয় লোকজন তাঁকে সড়কের নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ জানান। পরে তিনি নিজেও সড়কের একটি সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল একদিকে হেলে পড়তে দেখেন। ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, মাটি যথাযথভাবে কম্প্যাকশন না করে জিও টেক্সটাইলের ওপর নিম্নমানের ব্লক বসানো এবং ভিটবালুর পরিবর্তে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নুরুল ইসলাম পরদিন সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের উদ্যোগ নেন। এর পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করা হয় বলে দাবি করে জেলা বিএনপি। দলটির নেতারা এ ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করে এর প্রতিবাদ জানান।
প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। তাঁর দাবি, প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হয়েছে এবং নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় মাটির কাজের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং ইতিমধ্যে উত্তোলিত বিলের অর্থের একটি অংশ ভাগাভাগি করা হয়েছে বলেও লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়। তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ডও জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বরাদ্দ ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং এ পর্যন্ত ৩৭ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। গার্ডওয়াল হেলে পড়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা এবং ঠিকাদারকে ভালো কাজের জন্য সতর্ক করার কথাও তিনি জানিয়েছেন। ব্যক্তিগত বা স্থানীয় দেনা-পাওনার বিষয়ে বিভাগ অবগত নয় বলে তাঁর বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো—
১. প্রকল্পের শুরুতে দুর্নীতির পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে অতিরিক্ত মূল্য দেখানোর মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কাছ থেকে উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
৩. ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া নিম্নমানের কাজ বাতিল করে নকশা অনুযায়ী মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে নতুন করে কাজ করতে হবে।
৪. প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চলমান সব প্রকল্পের কাজ এবং সেসব প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে।
জেলা বিএনপি নেতারা বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আনা চাঁদা দাবির অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ-কাছিরগাতি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের লালপুর-সালামপুর সেতুর সংযোগ এবং প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও গার্ডওয়াল নির্মাণের কাজ ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও কালভার্ট জরুরি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির বরাদ্দ ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের নির্মাণকাজের মান ও চাঁদা দাবির অভিযোগ নিয়ে এর আগে সংসদ সদস্য, ঠিকাদারপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।