২৩ বছর পর নির্বাচন ঘিরে সরগরম পশ্চিম চর উমেদ, প্রচারে সম্ভাব্য প্রার্থীরা
লালমোহন (ভোলা):
ভোলার লালমোহন উপজেলার ৭ নম্বর পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে আবারও সরব হয়ে উঠেছে স্থানীয় রাজনীতি। সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য প্রার্থীরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারার পর নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনার খবরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আগ্রহ ও উৎসাহ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে। কেউ এলাকার উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, আবার কেউ ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ জোরদার করছেন। তবে এখনো নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা থাকলেও নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
এক নির্বাচনের পর দুই দশকেরও বেশি সময়
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়ন পরিষদে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৩ সালে। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ। এরপর সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ইউনিয়ন পুনর্গঠন ও আদালতে দায়ের করা মামলাসহ বিভিন্ন আইনি জটিলতায় দীর্ঘ সময় নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়নি।
২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর ১০ নম্বর মোতাহারনগর নামে নতুন ইউনিয়ন গঠন এবং পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়ন পুনর্গঠনের বিষয়টিও নির্বাচনী জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হয়। দুই ইউনিয়নের সীমানা ও ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি সামনে আসায় নির্বাচন আয়োজন আরও জটিল হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে তফসিল দিয়েও হয়নি ভোট
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ৯ মার্চ ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ১২ জন, সাধারণ সদস্য পদে ৫৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ১৩ জনসহ মোট ৮৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নেন।
তৎকালীন নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নের ১২টি কেন্দ্রে ৩১ হাজার ২৭৭ জন ভোটারের ভোট দেওয়ার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে নারী ভোটার ১৪ হাজার ৯৮৯ এবং পুরুষ ভোটার ১৬ হাজার ২৮৮ জন।
কিন্তু নির্বাচনের আগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া আদেশ অনুসরণ করে ৭ মার্চ নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ স্থগিত করে। রিট পিটিশন নম্বর ১৯৮৫/২০২৪-এর আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনী কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার পাশাপাশি নবগঠিত মোতাহারনগর ও পুনর্গঠিত পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি সামনে আসে।
ফলে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও ৯ মার্চের নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
আদালতের আদেশ ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক
পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নে নির্বাচন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল জাগো নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চেয়ারম্যান আবু ইউসুফের দায়িত্ব পালন, বরখাস্ত এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন আদেশ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। একই প্রতিবেদনে ইউনিয়ন পুনর্গঠন ও নতুন ইউনিয়ন গঠনের পর নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও উঠে আসে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১০ মে বিডি২৪লাইভের এক প্রতিবেদনে নির্বাচন না হওয়া এবং চেয়ারম্যান অপসারণের দাবিতে স্থানীয়দের মানববন্ধনের খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সীমানা-সংক্রান্ত মামলার কারণে নির্বাচন দীর্ঘদিন আটকে রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত আদেশ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এদিকে, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রভাষক মো. নুরুদ্দিনের গণসংযোগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভোটের অপেক্ষায় স্থানীয়রা
স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা, আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং ইউনিয়নের নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সম্ভাব্য প্রার্থীরাও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি জটিলতার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা কতটা বাস্তব রূপ পাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে নির্বাচন না হওয়া পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নের ভোটারদের এখন একটাই প্রত্যাশা—আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে তাঁরা যেন নিজের ভোটে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন।