ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ নিয়ে উত্তপ্ত জৈন্তাপুর
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। নিয়োগপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, প্রকাশিত ফলাফল যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয়নি। এ অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেল ৩টায় উপজেলার হরিপুর বাজার বাসস্ট্যান্ডে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে উপজেলা জুড়ে মাইকিং করে কর্মসূচির প্রচার চালানো হয়েছে। জৈন্তাবাসী এটিকে জৈন্তাপুরের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো ইউএনওর বিরুদ্ধে উপজেলা জুড়ে মাইকিং করে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন বলে দাবি করেছেন।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা থেকে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে কথিত ‘অবৈধ নিয়োগ’ বাতিল, পুনরায় নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ এবং ইউএনও সুনন্দা রায়ের প্রত্যাহারের দাবি জানানো হবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।
কর্মসূচির প্রচারে বলা হয়েছে—‘ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে টালবাহানা চলবে না’, ‘অবৈধ নিয়োগ মানি না, মানবো না’ এবং ‘দুর্নীতিবাজ ইউএনও প্রত্যাহার চাই’—এমন বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়েছে।
এর আগে শনিবার (৮ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে হরিপুর বাজারে ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভ করেন ছাত্রজনতা ও নিয়োগপ্রত্যাশীরা। বিক্ষোভ থেকে প্রকাশিত ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পুনরায় যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং ইউএনও সুনন্দা রায়ের অপসারণের দাবি জানানো হয়।
নিয়োগপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তারা প্রকাশিত ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নতুন করে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের দাবি জানান।
সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিজাম আহমদ বলেন, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বিতর্কিত ফলাফল বাতিল করা না হলে ইউএনও কার্যালয় ঘেরাওসহ আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তবে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায়। তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো জালিয়াতি হয়নি। নিয়োগের ক্ষেত্রে কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি—এসব যাচাই করা হয়নি।’
এদিকে ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ ইস্যুর পাশাপাশি জৈন্তাপুরের স্থানীয় বিএনপিতেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সময়ে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শাহজাহানকে দলীয় কার্যক্রম থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চিকনাগুল ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান প্রকাশ্যে এসেছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় জৈন্তিয়া প্রবেশগেট এলাকার ঘাটেরচটি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি পয়েন্টে শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার প্রতিবাদে সভা ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা দাবি করেন, শাহজাহানকে দলীয় কার্যক্রম থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার সিদ্ধান্তটি সাংগঠনিকভাবে যথাযথ হয়নি।
অন্যদিকে এর আগে রোববার (৯ আগস্ট) রাতে চিকনাগুল বাজারে ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এক জরুরি সভায় শাহজাহানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাকে দলীয় কার্যক্রম থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে শাহজাহান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, দলীয় নিয়ম অনুযায়ী কোনো অভিযোগ থাকলে উপজেলা বিএনপি ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল সাংগঠনিকভাবে বিষয়টি দেখবে।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাফিজ বলেন, ‘মো. শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। তবে ইউনিয়ন বিএনপি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার মাননীয় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ প্রসঙ্গে আব্দুল হাফিজ বলেন, ‘সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের বিষয়েও শিগগিরই সিদ্ধান্ত আসছে।’
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের এ বক্তব্যের পর ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত—দুই বিষয়েই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ নিয়ে এক পক্ষ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে ফলাফল বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে অভিযোগের সত্যতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়—এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।
মঙ্গলবার বিকেলে হরিপুর বাজারে অনুষ্ঠেয় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভাকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। কর্মসূচি থেকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত বা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, সেটিও এখন দেখার বিষয়।