শাহপরান মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে পুরোনো নথি ঘিরে নতুন প্রশ্ন, বিশেষ অডিট ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সিলেট : সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার দরগাহ ওয়াক্ফ এস্টেটের (ইসি নং-১৩৬৫১) ব্যবস্থাপনা, আয়-ব্যয়, দানবাক্সের অর্থ ও ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিশেষ অডিটের দাবি উঠেছে। বর্তমান মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদের দায়িত্ব পালনের আইনগত ভিত্তি যাচাই, পুরোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং মাজার পরিচালনায় নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আবেদনে ২০২৪ সালে সিলেট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পাঠানো তদন্ত-সংক্রান্ত নথি, ওয়াক্ফ প্রশাসনের পূর্ববর্তী আদেশ এবং হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নং-৬৪৮৬/২০১৪-এর মূল রেকর্ড যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মাজারের প্রকৃত আয়-ব্যয় নির্ধারণে দানবাক্স, ব্যাংক হিসাব, দোকানভাড়া, ইজারা ও অন্যান্য আয়-উৎসের ওপর বিশেষ অডিট পরিচালনার দাবি করা হয়েছে।
পুরোনো তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার দাবি
আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ১৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে স্মারক নং-০৫.৪৬.৯১০০.০০৮.৩৭.০০১.২৪.১৮৮৪-এর মাধ্যমে মাজারের ব্যবস্থাপনা ও মোতাওয়াল্লী নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ওই চিঠির সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনসহ প্রায় ৭৪ পৃষ্ঠার নথি পাঠানো হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সিলেট এবং ওয়াক্ফ পরিদর্শক ও হিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের বিভিন্ন স্মারকও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, এসব নথি ও পূর্ববর্তী তদন্তের ফলাফল একত্রে পর্যালোচনা করে কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দপ্তরের চিঠিপত্র ও তদন্তের পর্যায়ে থাকায় মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাই শুধু নতুন করে পত্রাচার না করে বিদ্যমান সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনগত অবস্থান সমন্বিতভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
২০১৩ সালের আদেশ ও ২০১৪ সালের রিট পিটিশন ঘিরে প্রশ্ন
আবেদনে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ের ২৪ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখের স্মারক নং-১৬৫(৩)-এর উল্লেখ রয়েছে। ওই স্মারকের সঙ্গে মাজারের পরিচালনা কমিটি গঠনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বলে আবেদনকারীরা জানিয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং-৬৪৮৬/২০১৪ দায়ের করা হয়েছিল বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। আবেদনকারীরা ওই মামলার মূল রেকর্ড, আদেশ, কোনো অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা এবং ২০১৩ সালের ওয়াক্ফ প্রশাসনের আদেশের বর্তমান কার্যকারিতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদের পূর্ববর্তী পদত্যাগপত্রের একটি ফটোকপি তাঁদের কাছে রয়েছে। তবে মূল বা প্রত্যয়িত কপি তাঁদের কাছে নেই বলে আবেদনে স্বীকার করা হয়েছে। এ কারণে ওই ফটোকপিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন না করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট মামলার মূল নথি এবং ওয়াক্ফ প্রশাসনের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে বিষয়টি যাচাই করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পদত্যাগপত্রটি আদৌ দাখিল করা হয়েছিল কি না, তা গৃহীত হয়েছিল কি না এবং এর ভিত্তিতে কোনো অব্যাহতি, পুনর্নিয়োগ বা দায়িত্বে বহাল রাখার আদেশ দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করে বর্তমান মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালনের আইনগত ভিত্তি নির্ধারণের দাবি করেছেন আবেদনকারীরা।
দেড় দশকের পুরোনো প্রশাসনিক নথি থেকে সাম্প্রতিক তদন্ত—সবকিছু যাচাইয়ের দাবি
মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবেদনকারীদের দাখিল করা নথিতে ২০১৩ সালের আদেশ, ২০১৪ সালের রিট মামলা, ২০২৪ সালের জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরের চিঠিপত্র এবং ২০২৬ সালের ওয়াক্ফ প্রশাসনের তদন্ত-সংক্রান্ত নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।
এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ইসলামিক ফাউন্ডেশন সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় থেকে জারি করা নোটিশে বর্তমান মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদ এবং অভিযোগকারী শেখ মো. লুৎফুর রহমান ও মো. আমিরুল ইসলামকে ৩০ সেপ্টেম্বর শুনানিতে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসনের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের স্মারক নং-১৬.০২.০০০০.০৪৩.৩১.০০০.২৬/২৩০(৪)-এ মাজারের মোতাওয়াল্লীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং নতুন আবেদন একত্রে বিবেচনা করে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে সুস্পষ্ট মতামতসহ পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনার কথা সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযোগকারীদের আগের সম্পূরক আবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে তাঁরা ৩২৬ পৃষ্ঠার নথিপত্র জমা দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারি চিঠি ও সংশ্লিষ্ট নথি তদন্তের মূল রেকর্ডে সংযুক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়।
৫৪ লাখ টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, বিশেষ অডিটের দাবি
মাজারের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের দাবি, ওই অর্থবছরে প্রদর্শিত ৫৪ লাখ টাকার হিসাবের যথার্থতা যাচাই করা প্রয়োজন। তবে মাজারের প্রকৃত আয় কত ছিল, তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি ও নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
আবেদনে দানবাক্সের হিসাব, অর্থ গণনার রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব ও স্টেটমেন্ট, ক্যাশবুক, লেজার, আয়-ব্যয়ের ভাউচার, দোকান ও স্থাপনার ভাড়া-ইজারা রেজিস্টার, মানত-নজরানার হিসাব, বার্ষিক আয়-ব্যয়ের বিবরণী এবং আগের অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি প্রয়োজনে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত প্রবাহ, হিসাবের অসংগতি, সংশ্লিষ্ট সময়কাল ও দায় নির্ধারণ করে প্রতিবেদন তৈরির দাবি করেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, নিরীক্ষায় কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তার পরিমাণ নির্ধারণ এবং ওয়াক্ফের অর্থ বা সম্পত্তির ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের সুপারিশ করা প্রয়োজন।
দানবাক্স পরিচালনায় সরকারি তদারকির প্রস্তাব
মাজারের দানবাক্স খোলা, অর্থ গণনা, হিসাবভুক্ত করা এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
তাঁদের প্রস্তাব, এসব কার্যক্রমে ওয়াক্ফ প্রশাসন বা জেলা প্রশাসনের মনোনীত সরকারি প্রতিনিধি এবং পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ গণনা ও জমাদানের লিখিত রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা সম্ভব হয়।
আবেদনে মাজারের দোকান, স্থাপনা, জমি ও অন্যান্য সম্পত্তির খতিয়ান, দাগ, জমির পরিমাণ, সীমানা, বর্তমান দখল, ভাড়া ও ইজারা যাচাই করে একটি হালনাগাদ সরকারি সম্পত্তি রেজিস্টার তৈরিরও দাবি জানানো হয়েছে।
নতুন পরিচালনা কমিটি গঠনের দাবি
মাজারের ব্যবস্থাপনায় সরকারি তদারকি, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন আবেদনকারীরা।
তাঁদের দাবি, জেলা প্রশাসন ও ওয়াক্ফ প্রশাসনের অনুমোদনক্রমে একটি নতুন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হোক। তদন্ত চলাকালে মাজারের অর্থ, হিসাবের খাতা, মূল রেজিস্টার ও সম্পত্তির নথি সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে এবং আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হলে বর্তমান মোতাওয়াল্লীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে তদন্ত ও শুনানি ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করার বিষয়টিও আবেদনকারীরা উল্লেখ করেছেন।
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
আবেদনকারীদের মূল দাবি হলো—আগের সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন, ওয়াক্ফ প্রশাসনের নথি, আদালতের মূল রেকর্ড এবং মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব একত্রে যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি ও গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আবেদনকারীদের লিখিতভাবে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এর সম্পত্তি সংরক্ষণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়টি জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
অভিযোগ এর বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদ এর মোবাইল নাম্বারে 01711334621 কল দিলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। জানা যায় তিনি বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন।