জলাশয় উদ্ধারে জোর দিচ্ছে সিসিক: প্রশাসক
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট:
নগরবাসীকে বন্যা ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত রাখতে জলাশয় উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ইতোমধ্যে নগরীর কয়েকটি জলাশয় পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ থাকলেও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে নগরীর দরগা গেইট এলাকার একটি হোটেলের হলরুমে সিলেট সিটি করপোরেশন ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা এসএনভির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে একই দিন প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে প্রশাসকের বক্তব্য ও কর্মশালার তথ্যের সঙ্গে আপনার দেওয়া তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।
সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সংরক্ষণ এবং পানি ধারণ ও শোষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণালব্ধ তথ্য ও সুপারিশের ভিত্তিতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগে নগর প্রকৌশলীদের নিয়ে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এসএনভি এর আগে সিলেট নগরীর বন্যা ঝুঁকি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নগরজুড়ে ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, একসময় সিলেট নগরীতে প্রায় ৯০০টি পুকুর ও ডোবা ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব জলাশয়ের অনেকগুলো ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে এর সামান্য অংশই অবশিষ্ট রয়েছে। একই সঙ্গে সুরমা নদীর পানি ধারণক্ষমতাও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে অতীতে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিত এবং পানি মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ত। এতে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
তিনি বলেন, নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর করতে সিটি করপোরেশন গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে। পানি প্রবাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত ড্রেন ও ছড়াগুলো পরিষ্কার করার পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এর সুফল পাওয়া গেছে। এবার অতিবৃষ্টির পরও দেশের বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও সিলেট নগরীতে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে।
সিসিক প্রশাসক বলেন, জলাশয়গুলো শুধু পানি ধারণ করে না; নগরের পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই যেসব জলাশয় ও ডোবা দখল বা ভরাট হয়ে গেছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
নগরবাসীকে বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে সুরক্ষা দিতে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট নগরবাসী বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাবেন। সিসিকের প্রধান প্রকৌশলীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত তথ্যেও প্রকল্পটির ব্যয় ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একটি উন্নত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও নগরবাসীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এবার অতিবৃষ্টির পরও নগরীতে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা না হওয়া সম্মিলিত উদ্যোগের একটি ইতিবাচক উদাহরণ।
নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করে সিসিক প্রশাসক বলেন, ছড়া, ড্রেন ও জলাশয়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। পাশাপাশি জলাশয় ও ডোবা উদ্ধারের উদ্যোগে সিটি করপোরেশনকে সহযোগিতা করতে হবে। নগরবাসী সচেতন ও দায়িত্বশীল হলে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও জলাবদ্ধতামুক্ত সিলেট গড়ে তোলা আরও সহজ হবে।
কর্মশালায় এসএনভির উদ্যোগে পরিচালিত ‘সিলেট সিটি কর্পোরেশনের স্পঞ্জ সিটি সমীক্ষা’য় নগরীর প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ, জলাধার, জলাভূমি ও পানি শোষণকারী এলাকার বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণার ভিত্তিতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানো এবং বৃষ্টির পানি ধারণ, মাটিতে শোষণ ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশনের সুযোগ বাড়াতে সবুজ-নীল অবকাঠামো সম্প্রসারণ, জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ, খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
পর্যায়ক্রমে রেইন গার্ডেন, পারমিয়েবল পেভমেন্ট, সবুজ ছাদ ও নগর জলাধারসহ বিভিন্ন প্রকৃতি-ভিত্তিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ সফল করতে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও নগরবাসীর সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। গবেষণা, সমন্বিত পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে সিলেটকে জলবায়ু-সহনশীল ‘স্পঞ্জ সিটি’তে রূপান্তরই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
এসএনভির নগরভিত্তিক পানি চক্রের টেকসই রূপান্তর প্রকল্পের ক্লাস্টার কো-অর্ডিনেটর মোছাম্মদ রাহিমা বেগমের সঞ্চালনায় কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন এসএনভির ড্রেনেজ অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজর মো. ইমাম হোসেইন। বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলী আকবর, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-২) সুমন চন্দ্র দাশ এবং প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব ব্যক্তির উপস্থিতি ও বক্তব্যের তথ্যও পাওয়া গেছে।
‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণায় নগরের বৃষ্টির পানি দ্রুত ড্রেনে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি জলাধার, জলাভূমি, সবুজ এলাকা ও পানি শোষণকারী অবকাঠামোর মাধ্যমে পানি ধরে রাখা ও মাটিতে শোষণের সুযোগ বাড়ানো হয়। সিলেটের বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় এ ধরনের সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে SNV-এর কাজ কয়েক বছর ধরে চলমান।