রায়নগর ট্রিপল হত্যাকাণ্ড: নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটির
সিলেট প্রতিনিধি:
সিলেট নগরীর রায়নগরে নিজ বাসভবনে ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছে ‘ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা কমিটি’। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, দীর্ঘদিনের মামলা, হুমকি ও অন্যান্য অভিযোগের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন কমিটির নেতারা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিটির সমন্বয়ক মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নগরীর রিকাবীবাজারে নির্মাণাধীন ‘ইম্পালস টাওয়ার’কে কেন্দ্র করে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। প্রায় দুই দশক ধরে এ বিরোধ নিয়ে বিভিন্ন আদালতে মামলা-মোকদ্দমা চলছে। নিহত আবদুস সাত্তার ওই ভূমি ও দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন বলে দাবি করেন তারা।
কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আবদুস সাত্তার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জিআর ০২/২০২১ নম্বর মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন। একই সঙ্গে কোতোয়ালী সিআর ১৩৬৪/২০২৩, ৮১৫/২০২৪ এবং স্বত্ব ২১১/২০২৩ নম্বর মামলার বাদী ছিলেন তিনি। এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।
বক্তাদের দাবি, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম কয়েকজন লোক নিয়ে রায়নগরে আবদুস সাত্তারের বাসায় যান। এ সময় তিনি পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমির মালিকানা দাবি করেন এবং স্বত্ব ২১১/২০২৩ নম্বর মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবদুস সাত্তারকে চাপ দেন বলে অভিযোগ করা হয়। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ওই ঘটনার পর নিহতের মেয়ে ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সেলিনা সুলতানা ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল রেকর্ডও রয়েছে বলে দাবি করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারির ঘটনাটির বিষয়টি অন্যান্য প্রকাশিত প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৮ মে আদালত প্রাঙ্গণে হামলার ঘটনায় আবদুস সাত্তার ও তৌহিদুল ইসলাম আহত হয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলাটি বর্তমানে ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলেও দাবি করা হয়।
ভূমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ভুয়া আমমোক্তারনামা ও জাল দলিলের মাধ্যমে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির মালিকানাধীন ভূমি দখল করে ‘ইম্পালস টাওয়ার’ নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন আদালতের রায় ও নথির বিষয়ও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
বক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালতের স্বত্ব ৩৭/২০১২ নম্বর মামলার রায়ে ১৮৫২২/২০০৬ ও ১৪০৬২/২০০৫ নম্বর দলিল অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা ৪৮৪/২০১৪ নম্বর ফার্স্ট আপিল খারিজ হয়ে নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে বলেও তারা দাবি করেন।
এ ছাড়া ভূমি জালিয়াতি এবং কবরস্থানকে বেআইনিভাবে ‘বাড়ি’ শ্রেণিতে পরিবর্তনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে সিরাজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুদক জিআর ০২/২০২১ নম্বর মামলা করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এসব অভিযোগ ও মামলার বিষয়ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ভিন্ন একটি কারণের কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ভূমি-বিরোধ ও মামলা প্রত্যাহারের হুমকির বিষয়টি সামনে এনে আলাদা অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, দুদক ও বিচার বিভাগের প্রতি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি জনগণের সামনে প্রকাশ, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ভূমি-সংক্রান্ত নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে সম্ভাব্য সব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
তাদের বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং আবদুস সাত্তার, সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের নথিপত্র ও অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানানো হয়।