পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে কফিনে ফেরা: কাতারে নিহত কানাইঘাটের পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ দেশে, আজ একসঙ্গে জানাজা
সিলেট, জুন: পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় কাতারে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু জীবনের সব স্বপ্ন থেমে গেল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। অবশেষে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরলেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসী যুবক।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল পৌনে ৭টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২২৬ ফ্লাইটে পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে মরদেহগুলো দেশে আনা হয়।
মরদেহ গ্রহণ করতে ভোর থেকেই বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন নিহতদের স্বজনরা। কফিনগুলো বের করে আনার সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে এবং তাদের হাতে আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেয়।
এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা আবুল হাসান, ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার আবু বকর, দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার লোকমান উদ্দিন, সিলেট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
পরে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহগুলো কানাইঘাট উপজেলার গাছবাড়ি এলাকায় নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আজ (মঙ্গলবার) দুপুর ২টায় দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের মাযাহিরুল উলূম কওমী মাদ্রাসা মাঠে পাঁচ প্রবাসীর সম্মিলিত জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাদের নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুন কাতারের শাহানিয়া এলাকায় সংঘটিত এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। একসঙ্গে পাঁচ প্রবাসীর মৃত্যুতে পুরো উপজেলাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিহতরা হলেন কানাইঘাট উপজেলার ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের ছেলে জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন, আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ, একই গ্রামের মৃত মড়া মিয়ার ছেলে জুবায়ের আহমদ এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ী গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদের আহমদ।
জানা গেছে, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে চার বছর আগে কাতারে গিয়েছিলেন কাদের আহমদ (৩৩)। আগামী মাসেই প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই ফেরা হলো কফিনে।
অন্যদিকে মাত্র দুই মাস আগে ছুটি কাটিয়ে কাতার ফিরে গিয়েছিলেন জুবায়ের আহমদ (২৮)। ১২ বছর আগে সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা মড়া মিয়াও প্রাণ হারিয়েছিলেন। এবার একই পরিণতি বরণ করলেন ছেলেও। জুবায়েরের বাড়িতে রয়েছে এক সন্তান এবং অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, যারা আজ অপেক্ষা করছেন তার নিথর দেহের জন্য।
নিহত জসিম উদ্দিন (৩৮) ছিলেন দুই সন্তানের জনক। বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তার পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া এই পাঁচ প্রবাসীর করুণ মৃত্যু শুধু তাদের পরিবার নয়, পুরো কানাইঘাটবাসীকেই শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।