বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, ১৩ সমঝোতা স্মারক নিয়ে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী
চীনের সঙ্গে ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব’ ঘোষণা, দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ফ্রান্স প্রতিনিধি:
মালয়েশিয়া ও চীন সরকারের আমন্ত্রণে ছয় দিনের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর সফলভাবে সম্পন্ন করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও ছিলেন।
গত ২১ জুন ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে চীন সফর করেন। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফর।
সফরের প্রথম দুই দিন তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। ২২ জুন পুত্রজায়ার পেরদানা পুত্রায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করেন। পরে দুই নেতার মধ্যে একান্ত ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর তাঁরা যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাসভবনে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তারেক রহমান।
সফর শেষে মালয়েশিয়া সরকারের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তাঁর সহধর্মিণীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
২২ জুন রাতে তিনি চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ২৩ ও ২৪ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নিয়ে “Climate Leadership in a Shifting Global Landscape” শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অর্থায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সম্মেলনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলোইস জভিংগির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তাঁকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত WEF-এর বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
২৪ জুন দালিয়ান থেকে হাই-স্পিড ট্রেনে বেইজিং পৌঁছালে চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের মন্ত্রী এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কমিটির সেক্রেটারি সুন মেইজুন তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বেইজিংয়ে অবস্থানকালে তিনি দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্ট হাউসে অবস্থান করেন।
চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই নেতা যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব’ (Bangladesh–China Community with a Shared Future) গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।
বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে মতৈক্য প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন এবং পরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক জাদুঘর পরিদর্শন করেন।
২৫ জুন গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের প্রিমিয়ার লি ছিয়াং প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সংবর্ধনা জানান। পরে দুই নেতার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এসব সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন কৌশলগত খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের নতুন ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই দিনে প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং এবং পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুয়িংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এছাড়া বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তুলে ধরেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য বয়ে এনেছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারিত্ব গঠনের ঘোষণা এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সফরের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।