সিলেট পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দালালের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকায় ‘সহজ’ সেবা!
মো. জুনেদ আহমদ
সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসকে ঘিরে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রশাসনিক রদবদল ও নজরদারি বাড়ানোর পরও অফিসের আশপাশে সেবাপ্রার্থীদের টার্গেট করে দ্রুত পাসপোর্ট করে দেওয়ার প্রলোভন এবং সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠছে।
সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়মে সরাসরি আবেদন করতে গিয়ে নানা জটিলতা ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হলেও দালালের মাধ্যমে তুলনামূলক সহজে কাজ হয়ে যায়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে সিলেট পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে দালালচক্রের সক্রিয়তার অভিযোগ উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে সেবাপ্রার্থীদের টার্গেট করে দ্রুত ই-পাসপোর্ট করে দেওয়ার প্রলোভনে টাকা নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি অফিসের বাইরের কিছু কম্পিউটার দোকান ও ট্রাভেল এজেন্সিকে ঘিরে দালালচক্রের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালেও সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দুজনকে জরিমানা ও মুচলেকা নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দালালরা সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে সরকারি ফির অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে পাসপোর্ট অফিসের গেটকর্মী মো. রুবেল মিয়াকে ঘিরে হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে ই-পাসপোর্টের জন্য নির্ধারিত ফি ও সম্ভাব্য সেবা প্রদানের সময়সীমা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইনে আবেদন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট গ্রহণ এবং নির্ধারিত মাধ্যমে ফি পরিশোধের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সরকারি চার্টারে ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদি সাধারণ ই-পাসপোর্টের ফি ৪ হাজার ২৫ টাকা এবং ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের ফি ৫ হাজার ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জরুরি ও অতি জরুরি সেবার জন্য আলাদা সরকারি ফি রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—সরকারি নির্ধারিত ফি, অনলাইন আবেদনব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সেবা প্রদানের সময়সীমা থাকার পরও কেন একজন নাগরিককে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দালালের সহায়তা নিতে হবে?
দালালচক্রের তৎপরতা বন্ধে অফিসের ভেতর ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ যাচাই এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দালালদের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান, কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং সেবাপ্রার্থীদের জন্য তথ্য ও সহায়তা ডেস্ক আরও কার্যকর করার দাবি রয়েছে।
সিলেট পাসপোর্ট অফিসে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি ও দালালনির্ভরতা কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তা স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই—সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়েই যদি পাসপোর্ট পাওয়ার কথা থাকে, তাহলে ‘সহজ সেবা’র নামে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে কেন?