জৈন্তাপুরে কৃষক-শ্রমিকের জনপদে পৌরসভা নয়, ইউনিয়ন পরিষদই চান নাগরিকরা
জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি: সিলেটের জৈন্তাপুরে প্রস্তাবিত পৌরসভা বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সচেতন নাগরিক ফোরাম। শনিবার (১৫ আগস্ট) বিকেল ৫টায় জৈন্তাপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত পৌরসভা গঠনের প্রক্রিয়ায় ভুল তথ্য উপস্থাপন ও সীমানা নির্ধারণে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পুনরায় নিরপেক্ষভাবে সরেজমিন তদন্তের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিজপাট ও জৈন্তাপুর ইউনিয়নের সচেতন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক মো. জালাল উদ্দিন। এ সময় সংগঠনের যুগ্ন আহবায়ক বুরহান আহমেদ, সদস্য সচিব আব্দুল কাইয়ুম সরকার, সদস্য কামাল হোসেন, উপজেলা শ্রমীকদলের সভাপতি আব্দুর রব, বিশিষ্ট মুরব্বি হোসাই আহমেদ ও মাওলানা এবাদুর রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত ১৪ জুলাই তারিখে জৈন্তাপুর উপজেলার ১ নম্বর নিজপাট ইউনিয়ন ও ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের ১২টি মৌজা নিয়ে প্রস্তাবিত জৈন্তাপুর পৌরসভার গেজেট প্রকাশ করে সরকার। তবে সচেতন নাগরিক ফোরামের দাবি, পৌরসভা বাস্তবায়নের জন্য এ অঞ্চল এখনো উপযুক্ত নয় এবং পৌরসভা গঠনের প্রস্তাব তৈরির ক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অধিকাংশ তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তাবিত পৌরসভার সীমানা নির্ধারণেও নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনটির দাবি, প্রস্তাবিত পৌরসভা গঠনের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর থেকেই এলাকার অধিকাংশ মানুষ ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাবিত পৌরসভা বাতিলের দাবিতে মৌজাভিত্তিক লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট ১ নম্বর নিজপাট ও ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের প্রস্তাবিত পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন মৌজার হাজার হাজার মানুষের গণস্বাক্ষরিত আপত্তিপত্র জেলা প্রশাসক, সিলেট বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন-২০০৯-এর বিধান এবং বাস্তব তথ্যের সঙ্গে প্রস্তাবিত পৌরসভা গঠনের প্রজ্ঞাপনের অসঙ্গতি রয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভৌগলিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় জৈন্তাপুরে পৌরসভা গঠনের যৌক্তিকতা নেই। তারা বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থাতেই সন্তুষ্ট এবং পৌরসভা গঠনের আগে সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, প্রস্তাবিত পৌরসভা এলাকার ১২টি মৌজার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া একটি বড় অংশ শ্রমিক ও দিনমজুর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। এলাকায় উল্লেখযোগ্য শিল্প-কারখানা নেই এবং উপজেলা সদরের একটি বাজার ছাড়া অন্যান্য এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণও সীমিত বলে দাবি করা হয়। নদী থেকে বালু উত্তোলনকারী শ্রমিক, ধান ও শাক-সবজি উৎপাদনকারী কৃষকদের ওপর পৌরসভা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
অকৃষি জমির হিসাব তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নিজপাট ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ ৮ হাজার ৪২৪ দশমিক ৫৭ একর। এর মধ্যে অকৃষি জমি ৭৫৪ দশমিক ৬০ একর, যা মোট জমির ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নে মোট জমির পরিমাণ ১১ হাজার ৪৪৮ একর এবং অকৃষি জমির পরিমাণ ৩ হাজার ১৩৬ একর, যা ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। দুই ইউনিয়নের ৪৮টি মৌজার মধ্যে ১২টি মৌজা নিয়ে পৌরসভা গঠনের প্রস্তাব করা হলেও সামগ্রিক বাস্তবতায় অকৃষি জমির হার প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় কম বলে দাবি করা হয়।
জনসংখ্যার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ১ নম্বর নিজপাট ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৩৭ হাজার ১৮০ এবং ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৩৩ হাজার ৮৫০ জন। দুই ইউনিয়ন মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ৭১ হাজার ৩০ জন। অথচ প্রস্তাবিত পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত ১২টি মৌজার জনসংখ্যা ২৬ হাজার ৮৫১ জন বলে দাবি করা হয়েছে। এ অবস্থায় পৌরসভা গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জনসংখ্যার শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সচেতন নাগরিক ফোরাম।
সংগঠনটির বক্তব্য, দুই ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ৭১ হাজার ৩০ জনের মধ্যে প্রস্তাবিত ১২টি মৌজায় যদি ৫০ হাজার জনসংখ্যা দেখানো হয়, তাহলে অবশিষ্ট ৩৬টি মৌজায় মাত্র ২১ হাজার ৩০ জন জনসংখ্যা থাকার কথা। এ হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়।
প্রস্তাবিত পৌরসভার ১২টি মৌজার মধ্যে তিনটি মৌজা সরকারি তপশিল অনুযায়ী হাওর এলাকা বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো—কেন্দ্রী হাওর, ডিবির হাওর ও বিরাইমারা হাওর। এসব এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত এবং ডিবির হাওরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ মৎস্যজীবী বলে দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, প্রস্তাবিত পৌরসভা গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ভুল তথ্য উপস্থাপন করে থাকলে তা পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। সংগঠনটির দাবি, কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশের উদ্দেশ্যে নয়, বরং স্থানীয় মানুষের বাস্তব জীবন-জীবিকা, কৃষি, অর্থনীতি, ভৌগলিক অবস্থান ও সামাজিক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
সচেতন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “আমরা ভুল তথ্যের মাধ্যমে নয়, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতিমালা অনুযায়ী জৈন্তাপুরে পৌরসভা গঠনের উপযুক্ততা যাচাই চাই। পুনরায় নিরপেক্ষভাবে সরেজমিন তদন্ত করে সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ভুল তথ্য ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রস্তাবিত পৌরসভা গঠনের প্রক্রিয়া অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে।”
সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবিত পৌরসভা গঠনের রূপরেখা পুনর্বিবেচনা, নিরপেক্ষ সরেজমিন তদন্ত এবং সঠিক তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ ব্যবস্থা বহাল রাখার দাবিও জানানো হয়েছে।