ইতালি পাঠানোর নামে মানবপাচার: জগন্নাথপুরে নারীসহ দুই ভাই-বোন গ্রেপ্তার
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে নারীসহ দুই ভাই-বোনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতে সিলেট মহানগরের শাহপরান থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে চারটি মামলা রয়েছে এবং তারা এসব মামলায় দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের মনফর আলীর মেয়ে মোছা. শোবি বেগম (৩০) ও তাঁর ভাই শামছুল (২৮)। জগন্নাথপুর থানার এসআই মো. নূর হোসেনের নেতৃত্বে এসআই মো. মতিউর রহমান, এসআই মোস্তাফিজুর রহমান, এসআই অনিক পালসহ পুলিশের একটি দল এ অভিযান চালায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শোবি বেগম ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হতো। গ্রেপ্তারের পর কয়েকজন ভুক্তভোগীও তাঁদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সামনে এসেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো। পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাঁদের লিবিয়ায় পাঠানো হলে সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন এবং স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো। কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, লিবিয়ায় আটকে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের ভিডিও বা অডিও স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের ভুক্তভোগী সইফুল মিয়ার অভিযোগ, ইতালি পাঠানোর কথা বলে বিভিন্ন দফায় তাঁর কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে তাঁকে লিবিয়ায় আটকে রেখে আরও টাকা দাবি করা হয় এবং নির্যাতন করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
একই গ্রামের আবু তাহের মিয়ার অভিযোগ, তাঁর ছেলে বিন আমিনকে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাঁকে লিবিয়ায় আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো এবং অতিরিক্ত টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক ভুক্তভোগী সেলিমের অভিযোগ, ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে তাঁর কাছ থেকে মোট ৪৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে তাঁকেও লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে তিনি জানান। এছাড়া এলাক মিয়ার মেয়ের জামাই এমরান হোসেন আদিলও একই ধরনের প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পৃথক অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, শোবি বেগমের স্বামী ইতালিতে এবং তাঁর দুই ভাইয়ের একজন ইতালি ও অন্যজন লিবিয়ায় অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশে থাকা শোবি বেগম ও তাঁর ভাই বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ সংগ্রহ করতেন। তবে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।
গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে লিবিয়ায় আটকে থাকা বাংলাদেশিদের উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ এবং প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
জগন্নাথপুর থানার এসআই মো. নূর হোসেন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।