Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
লিংক channeljaintanews24.com ক্যাটাগরি মৌলভীবাজার রিপোর্ট চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

জুড়ীর জাম্বুরায় বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য, ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ফল—এবার লক্ষ্য রপ্তানি

০৮ নভেম্বর ২০২৬ • ০১:০৪ অপরাহ্ন

জুড়ী (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:

একসময় স্থানীয় বাজারে তেমন চাহিদা ছিল না। উৎপাদিত জাম্বুরা বিক্রি করতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তেন কৃষকেরা। সময়ের ব্যবধানে সেই অবহেলিত ফলই এখন মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যে পরিণত হয়েছে। স্বাদ, আকার ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে জুড়ীর জাম্বুরার চাহিদা। সিলেট বিভাগের গণ্ডি পেরিয়ে এখন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে এ ফল। এতে বাড়ছে কৃষকের আয়, বদলাচ্ছে তাঁদের জীবনযাত্রা। এবার দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।


স্থানীয়ভাবে ‘মাতু জামির’ নামে পরিচিত জাম্বুরা জুড়ী উপজেলার টিলাবেষ্টিত গ্রাম ও বসতবাড়ির আশপাশে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়। ফলটির স্বাদে রয়েছে টক, মিষ্টি ও হালকা তিতার মিশ্রণ। স্বতন্ত্র স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এটি। কেউ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি জাম্বুরা চাষ করে বাড়তি আয় করছেন, আবার কোনো কোনো পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ ফল।


উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জুড়ীর হায়াছড়া, শুকনাছড়া, জামকান্দি, দুর্গাপুর, গোবিন্দপুর, বিনোদপুর, লালছড়া, রূপাছড়া, লাঠিটিলা, ডোমাবাড়ী, কুচাইরতল, কচুরগুল ও পুটিছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জাম্বুরার আবাদ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে ১০ হাজারের মতো জাম্বুরাগাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।


কৃষকদের ভাষ্য, একটি পরিণত জাম্বুরাগাছে সাধারণত ১০০ থেকে ৫০০টি ফল ধরে। কোনো কোনো গাছে ফলের সংখ্যা এক হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তুলনামূলক কম খরচে চাষাবাদ এবং বাজারে চাহিদা বাড়ায় জাম্বুরা এখন তাঁদের কাছে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় একটি ফল।


জুড়ীর লাঠিটিলা সড়কের কালামাটি নামের ত্রিমুখী পয়েন্টটি মৌসুমে পরিণত হয় জাম্বুরা বেচাকেনার অন্যতম কেন্দ্রে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পিকআপভ্যানে করে ফল নিয়ে আসেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। সেখানে আকার ও মান অনুযায়ী বাছাই করে বস্তাবন্দী করা হয়। পরে বড় ট্রাকে করে এসব জাম্বুরা পাঠানো হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন ফলের বাজারে।


স্থানীয় ব্যবসায়ী কালা মিয়া ও হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁরা প্রতিবছর অগ্রিম চুক্তিতে একাধিক জাম্বুরাবাগান কিনে নেন। মৌসুমে শ্রমিক দিয়ে ফল সংগ্রহ করে বাছাই ও বস্তাবন্দী করার পর ঢাকার যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারে পাঠান। সেখানে আকার ও মানভেদে প্রতি বস্তা জাম্বুরা এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়।


ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ফল ব্যবসায়ী মারুফ আহমদ বলেন, জুড়ীর জাম্বুরার চাহিদা তাঁদের বাজারে অনেক বেশি। স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় ক্রেতারা এ ফল পছন্দ করেন এবং দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।


কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে অনলাইনভিত্তিক ফল বিপণন। প্রিমিয়াম ফ্রুটসের স্বত্বাধিকারী আবু সাঈদ আল সাগর জানান, গত দুই বছর ধরে তাঁরা জুড়ী থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন। চাহিদা বাড়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ভবিষ্যতে জুড়ীর জাম্বুরা বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।


তিনি মনে করেন, ফলটির স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।


জুড়ীর জাম্বুরার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কৃষি বিভাগও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-১’ ও ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-২’ নামে দুটি জাত শনাক্ত ও উদ্ভাবন করা হয়। আকারে বড় ও সুস্বাদু এ জাত দুটির মধ্যে একটির শাঁস গাঢ় লাল, অন্যটির শাঁস আংশিক সাদা। স্থানীয়ভাবে শুকনাছড়া গ্রামের প্রবীণ কমলাচাষি প্রয়াত ইব্রাহিম আলীর বাড়িতে এসব জাতের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।


এ ছাড়া জুড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে আরও ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের সন্ধান পেয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে বাতাবিলেবু-১, বাতাবিলেবু-২ ও বারি বাতাবিলেবু-৫-এর চারা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের বাগানের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, জুড়ীতে জাম্বুরা প্রাকৃতিকভাবেই ভালো জন্মে। এখানকার জাম্বুরার জাতগুলো অত্যন্ত ভালো। সারাদেশে বাতাবিলেবুর চাহিদা থাকলেও বাজারে সব সময় মানসম্মত জাতের ফল পাওয়া যায় না।


তিনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া ১৬টি সম্ভাবনাময় জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি কৃষকদের জাম্বুরা চাষের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব।


জাম্বুরার বাজার সম্প্রসারণে অনলাইন বিক্রিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রিমিয়াম ফ্রুটস স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে অনলাইনে বিক্রির জন্য জাম্বুরা সংগ্রহ করছে। এতে কৃষকেরা প্রতিটি ফল প্রায় ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করতে পারছেন। একসময় যে ফল পাইকাররা মাত্র ২ টাকা দরে কিনতেন, বর্তমানে সেই ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা আগের তুলনায় ভালো মূল্য পাচ্ছেন। এতে জাম্বুরা চাষে তাঁদের আগ্রহও বাড়ছে।


তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি জাম্বুরা চাষে কিছু সমস্যাও রয়েছে। শুকনাছড়া, লালছড়া ও জড়িছড়া এলাকার কয়েকজন কৃষক জানান, গান্ধিপোকাসহ বিভিন্ন রোগবালাই এবং কাঠবিড়ালির উপদ্রবে অনেক ফল নষ্ট হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষি বিভাগের কার্যকর পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চান তাঁরা।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, জুড়ীর জাম্বুরাকে বাণিজ্যিকভাবে আরও সম্ভাবনাময় করে তুলতে উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ফল সংগ্রহ-পরবর্তী সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি উপযুক্ত প্যাকেজিং ও গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।


একসময় যে জাম্বুরা বিক্রি করা নিয়ে কৃষকদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো, সেই ফলই এখন তাঁদের বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে জুড়ীর ঐতিহ্যবাহী জাম্বুরা একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পেতে পারে।

বিজ্ঞাপন channeljaintanews24.com