Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
লিংক channeljaintanews24.com ক্যাটাগরি সিলেট রিপোর্ট চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

ওসমানী হাসপাতালে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন: হামলা-সংঘর্ষ, কর্মবিরতিতে ভোগান্তি

০৫ নভেম্বর ২০২৬ • ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

সিলেট প্রতিনিধি:

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সংঘর্ষ, মারধরের অভিযোগ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির ঘটনা বারবার সামনে আসছে। কখনো রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে, আবার কখনো চিকিৎসক ও ইন্টার্নদের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনদের মারধর ও সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন, মামলা ও আটকের মতো পদক্ষেপ দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।


সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর রাতে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় রোগীর স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক। তাঁরা হলেন দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল এবং সিলেটভিউ২৪ ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার। তাঁদের অভিযোগ, রোগীর স্বজনদের মারধরের দৃশ্য ধারণ করতে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। এতে দুজনই আহত হন।


ঘটনার সময় রোগীর দুই স্বজনকে আটকে রাখার খবর পেয়ে পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে বলে পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। ৩১ অক্টোবর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।


ঘটনার পর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।


জানুয়ারিতে সংঘর্ষ, আটক তিন


এর আগে ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে হাসপাতালের চতুর্থ তলায় চিকিৎসাসেবা নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে রোগীর স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ কয়েকজন আহত হন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরে রোগীর তিন স্বজনকে আটক করে পুলিশ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। অন্যদিকে, নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।


জুলাইয়ে সংঘর্ষ, কর্মবিরতি


একই বছরের ৭ জুলাই রাতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এক ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করেন। একই দাবিতে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের কর্মসূচি দেন। ঘটনাটি আবারও হাসপাতালের নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসে।


রোগীর স্বজনকে লাথি মারার অভিযোগ


২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিলের দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজনকে চিকিৎসকের লাথি মারার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এক চিকিৎসককে রোগীর এক স্বজনকে লাথি মারতে দেখা যায় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসক তন্ময় দেবনাথকে দায়িত্ব থেকে বিরত রেখে তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল ও পরবর্তী বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।


প্রবীণ রোগীকে মারধরের অভিযোগ


২০২৪ সালের ২১ মার্চ ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭৯ বছর বয়সী প্রবীণ রোগী অমর চাঁদ দাসকে মারধরের অভিযোগ ওঠে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী হাসপাতাল পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অন্যদিকে, এক নারী চিকিৎসকও ওই রোগীর বিরুদ্ধে খারাপ আচরণের অভিযোগ তুলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানান। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করে। অর্থাৎ এ ঘটনাতেও উভয় পক্ষের অভিযোগ সামনে আসে।


রোগীর মৃত্যু ঘিরে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ


২০২৩ সালের ২১ আগস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে উত্তেজনা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ছিল, যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁদের রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে চিকিৎসক-নার্সদের হেনস্তা এবং ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করে পুলিশ। ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতি ঘোষণা করেন।


কর্মবিরতি ও প্রশাসনিক ভবনে তালার ঘটনা


২০২২ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হামলার অভিযোগ তুলে কর্মবিরতি, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়ার কর্মসূচি পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। ওই সময় হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগও ওঠে। পরে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের করা মামলায় আবদুল্লাহ নামে এক যুবকসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়।


একই বছরের ১২ আগস্ট হাসপাতালের চতুর্থ তলার ১ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর স্বজন রুবেনা বেগম (২৭) মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।


সাংবাদিককে অবরুদ্ধ করার অভিযোগ


২০২১ সালের নভেম্বরেও হাসপাতালে এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। ওই সাংবাদিক তাঁর গুরুতর অসুস্থ শ্বশুরকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরুতে বিলম্বের অভিযোগ করেন। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের উপপরিচালকের কাছে ফোন করার পর ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাঁর ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ করা হয়। পরে খবর পেয়ে অন্য সাংবাদিকেরা হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেন।


রোগীর স্বজনদের মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগ


২০১৯ সালের ১২ মার্চ হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে রোগীর দুই স্বজনকে মারধর করেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁদের জনসমক্ষে কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগও ওঠে। আহতরা যাতে অভিযোগ করতে না পারেন, সে জন্য সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। ওই ঘটনায় আহত দুজন ছিলেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসমাইল আলী (৩৫) ও জ্যোতিন্দ্র বিশ্বাস (২৫)।


এর আগে ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রোগী দেখতে হাসপাতালে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা দাবি করাকে কেন্দ্র করে বচসা ও হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে রোগীর দুই স্বজন আহত হন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।


তদন্ত কমিটি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন


হাসপাতালের এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটিতে তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্তকে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা, মামলা এবং পুলিশি আটকের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। ফলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে।


ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০৮ সালেও কয়েকজন ফটোসাংবাদিকের ওপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার অভিযোগ উঠেছিল বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। সে সময় সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।


নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি


ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিলেটসহ বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রোগীর স্বজন, সাংবাদিক, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী—কারও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া কাম্য নয়।


রোগীর স্বজনদের ওপর হামলা কিংবা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা এবং তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষের অভিযোগের জবাবে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখা বা রোগীদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসেবা সচল রাখার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। অন্যথায় বারবার সংঘর্ষ, হামলা ও কর্মবিরতির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

বিজ্ঞাপন channeljaintanews24.com