Template: 3
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ০২:৪০ পূর্বাহ্ন

জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ পর্ব এক: ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বিশ্বাসঘাতকতা
ছবি

লেখক: আসিফ আযহার


১৮২৪-এর মৈত্রী থেকে ১৮৩৫-এর দখল—কীভাবে স্বাধীন জৈন্তিয়া ব্রিটিশ শাসনের অধীনে গেল


উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেও উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্য তখনো স্বাধীন ছিল। এর মধ্যে জৈন্তিয়া, আহোম, কাছাড় ও মণিপুর ছিল উল্লেখযোগ্য। এই অঞ্চলগুলো একদিকে ব্রিটিশ শক্তির বিস্তার এবং অন্যদিকে বার্মিজ সামরিক শক্তির উত্থানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক এলাকায় পরিণত হয়েছিল।


১৮১৯ সাল থেকে বার্মিজ বাহিনী উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যে মণিপুর, আহোম, কাছাড় ও আরাকানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরিস্থিতির এক পর্যায়ে বার্মিজ বাহিনী জৈন্তিয়া ও ব্রিটিশ-অধিকৃত সিলেটের দিকেও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।


এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের কাছে জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জৈন্তিয়া পাহাড় অতিক্রম করে আহোম অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ ব্রিটিশ বাহিনীকে বড় সুবিধা দিতে পারত। ফলে বার্মিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় ব্রিটিশরা জৈন্তিয়ার সঙ্গে মৈত্রীসম্পর্ক গড়ে তোলে।


১৮২৪ সালের ১০ মার্চ জৈন্তিয়ার রাজা রামসিংহ ও ব্রিটিশদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড ব্রিটিশ সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্মকর্তা ডেভিড স্কট জৈন্তিয়ার রাজার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আহোমের দিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। জৈন্তিয়ার সহযোগিতা ব্রিটিশ বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ১৮২৬ সালের ইয়ানদাবু সন্ধির মাধ্যমে শেষ হলে বার্মিজদের উত্তর-পূর্ব ভারতের ওপর প্রভাব ভেঙে পড়ে। এরপর ব্রিটিশরা আহোম ও কাছাড়সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তবে তখনও জৈন্তিয়ার স্বাধীনতা বহাল রাখা হয়।


মৈত্রী থেকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব


জৈন্তিয়ার সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্কের এই পর্যায়টি ছিল পারস্পরিক প্রয়োজনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশদের প্রয়োজন ছিল জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড ও রাজার সহযোগিতা; আর জৈন্তিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।


কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।


জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে চুনাপাথরের খনি ও অন্যান্য সম্পদের কারণে অঞ্চলটি ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গবেষণামূলক ঐতিহাসিক বর্ণনায়ও জৈন্তিয়ার চুনাপাথরের খনিগুলোকে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


ব্রিটিশদের উচ্চপর্যায়ের নীতির সঙ্গে স্থানীয় কর্মকর্তাদের নীতির মধ্যে পার্থক্যও তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জৈন্তিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে সমঝোতা থাকলেও স্থানীয় ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে রাজ্যটির ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজতে থাকেন—এমন ব্যাখ্যা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।


রামসিংহের মৃত্যুর পর সুযোগ


১৮৩২ সালে রাজা রামসিংহের মৃত্যু হলে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সিংহাসনে বসেন রাজেন্দ্র সিংহ। তিনি ইন্দ্র সিংহ নামেও পরিচিত ছিলেন। নতুন রাজা ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং পূর্বসূরির তুলনায় প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতায় দুর্বল।


এই সময় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জৈন্তিয়ার ওপর নতুন কিছু দাবি উত্থাপন করতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বার্ষিক ১০ হাজার টাকা কর বা খাজনা প্রদানের দাবি। কিন্তু জৈন্তিয়ার পূর্ববর্তী চুক্তির কাঠামোর সঙ্গে এই দাবির সামঞ্জস্য নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।


রাজেন্দ্র সিংহ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।


এরপর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পুরোনো একটি ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসে—গোভায় কয়েকজন আহোম নাগরিককে হত্যা বা বলির অভিযোগ।


গোভার ঘটনা কী ছিল?


গোভা ছিল জৈন্তিয়ার অধীনস্থ একটি সামন্ত অঞ্চল। বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যের নগাঁও অঞ্চলের সঙ্গে এর অবস্থান সম্পর্কিত।


১৮৩২ সালের দিকে গোভায় কয়েকজন আহোম নাগরিককে আটক করে হত্যার ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় জৈন্তিয়ার রাজার কাছে প্রতিকার দাবি করে।


তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঘটনাটি জৈন্তিয়ার রাজধানীতে সংঘটিত হয়নি এবং রাজা রামসিংহের শাসনামলের শেষ দিকে এটি ঘটে। পরবর্তীতে রাজেন্দ্র সিংহ সিংহাসনে বসেন।


ঐতিহাসিক সূত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা অনুযায়ী, রাজেন্দ্র সিংহ শেষ পর্যন্ত ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজনকে ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্মকর্তার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। একটি গবেষণামূলক সূত্রে বলা হয়েছে, ১৮৩৪ সালের আগস্টে রাজা চারজন অভিযুক্তকে ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তর করেন।


এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহুল প্রচলিত বর্ণনায় মনে হতে পারে, অভিযুক্তদের হস্তান্তরে রাজা অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং সেই কারণেই ব্রিটিশরা জৈন্তিয়া দখল করেছিল। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, অভিযুক্তদের হস্তান্তরের ঘটনাও ঘটেছিল।


তাহলে দখলের কারণ কী?


এখানেই জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত।


একটি সরকারি ও প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় মানববলির অভিযোগকে ব্রিটিশ দখলের অন্যতম প্রধান অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আরও কিছু গবেষণামূলক বর্ণনায় বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের হস্তান্তরের পরও ব্রিটিশ-জৈন্তিয়া সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি; বরং পরবর্তী সময়ে কর, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ভূখণ্ড এবং ব্রিটিশ স্বার্থ নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে।


ভারতের ২০১১ সালের আদমশুমারি-সংক্রান্ত জৈন্তিয়া হিলসের জেলা হ্যান্ডবুকেও বলা হয়েছে, ১৮২৪ সালের চুক্তির দুই প্রধান স্বাক্ষরকারী—ডেভিড স্কট ও রাজা রামসিংহ—দুজনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর পুরোনো ও নতুন নানা সমস্যা থেকে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ১৮৩৫ সালের মার্চে জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল ব্রিটিশরা দখল করে।


অর্থাৎ, গোভার ঘটনাটি ব্রিটিশদের হাতে একটি আইনি ও রাজনৈতিক অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়।


‘হিস্টরি অব আসাম’-এর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন


জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উৎস স্যার এডওয়ার্ড গেইটের A History of Assam। কিন্তু পরবর্তী কিছু লেখক ও গবেষকের মতে, গেইটের বর্ণনায় রাজেন্দ্র সিংহ কর্তৃক অভিযুক্তদের ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।


এ কারণেই জৈন্তিয়ার ইতিহাসের কিছু স্থানীয় গ্রন্থে ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের কোনো প্রতিকারই করা হয়নি।


অন্যদিকে সৈয়দ মুর্তাজা আলীসহ পরবর্তী ঐতিহাসিক আলোচনায় এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে যে, রাজা শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তদের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দিয়েছিলেন।


এখানে তাই ইতিহাসের দুটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি—ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।


রাজেন্দ্র সিংহ কি সত্যিই নরবলির সঙ্গে জড়িত ছিলেন?


রাজেন্দ্র সিংহের বিরুদ্ধে নরবলি বা হত্যাকাণ্ডে ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়টিও বিতর্কিত।


সৈয়দ মুর্তাজা আলীর আলোচনায় রাজেন্দ্র সিংহকে একজন কোমলমতি, ধর্মপ্রাণ ও বৈষ্ণব রাজা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরবর্তী অনুসন্ধানেও তাঁর ব্যক্তিগতভাবে নরবলির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।


তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত চরিত্রমূল্যায়নকে সরাসরি প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে সমসাময়িক নথি ও প্রত্যক্ষ সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।


অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন


জৈন্তিয়ার পতনের পেছনে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে দায়ী করলে পুরো প্রেক্ষাপটটি ধরা পড়ে না।


জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল ছিল অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চুনাপাথর ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্রিটিশদের আগ্রহের কারণ ছিল। একই সঙ্গে জৈন্তিয়া ছিল ব্রিটিশ-অধিকৃত সিলেট এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত ভূখণ্ড।


ঐতিহাসিক গবেষণায় এমন তথ্যও পাওয়া যায় যে, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজস্ব ও রাজকোষের পরিমাণ নিরূপণ করেছিলেন। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজ্যের নগদ রাজস্ব বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং রাজকোষে প্রায় ২০ লাখ টাকা জমা ছিল বলে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন। এরপর রাজেন্দ্র সিংহের ওপর চাপ বাড়ানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়।


এই তথ্য জৈন্তিয়া দখলের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।


১৮৩৫: স্বাধীন জৈন্তিয়ার শেষ অধ্যায়


১৮৩৫ সালের মার্চে ব্রিটিশরা জৈন্তিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়।


ঐতিহাসিক সূত্রের অধিকাংশে ১৫ মার্চ ১৮৩৫ তারিখে ক্যাপ্টেন লিস্টারের নেতৃত্বে দুই কোম্পানি সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রি জৈন্তাপুরের রাজধানী দখল করে এবং জৈন্তিয়া পরগনা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করে বলে উল্লেখ রয়েছে।


সিলেট জেলা প্রশাসনের একটি সরকারি প্রকাশনায় অবশ্য ১৬ মার্চ ১৮৩৫ তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেদিন রাজেন্দ্র সিংহকে বন্দী করার কথা বলা হয়েছে।


অতএব, তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে এক দিনের পার্থক্য থাকলেও ১৮৩৫ সালের মার্চেই জৈন্তিয়া রাজ্যের সমতলাঞ্চল ব্রিটিশ কর্তৃত্বে চলে যায়—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ঐকমত্য রয়েছে।


ব্রিটিশরা জৈন্তাপুরের রাজধানী দখল করে। রাজেন্দ্র সিংহকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি সিলেটে অবস্থান করেন এবং তাঁকে মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে।


জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল সরাসরি ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলও শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ফলে কয়েক শতাব্দীর জৈন্তিয়া রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্বের অবসান ঘটে।


ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন


জৈন্তিয়ার পতনকে শুধু ‘নরবলি বন্ধের অভিযান’ হিসেবে দেখলে ঘটনাটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়ালে পড়ে যায়। আবার কেবল ‘সম্পদ লুটের পরিকল্পনা’ হিসেবে দেখালেও ব্রিটিশদের সরকারি যুক্তি, সীমান্ত রাজনীতি এবং তৎকালীন প্রশাসনিক বিরোধগুলো উপেক্ষিত হয়।


নথিপত্র থেকে যে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় তা হলো—১৮২৪ সালে জৈন্তিয়া ও ব্রিটিশদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল; প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড ব্রিটিশদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল; ১৮৩২ সালে রামসিংহের মৃত্যুর পর সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়; রাজেন্দ্র সিংহের আমলে কর ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়; গোভার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগকে ব্রিটিশরা সামনে আনে; এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৩৫ সালের মার্চে জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল দখল করে নেয় ব্রিটিশরা।


সুতরাং জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘চুক্তিভঙ্গ’, ‘মানববলি’, ‘অর্থনৈতিক স্বার্থ’ ও ‘ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ’—প্রতিটি শব্দের পেছনে আলাদা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। কোনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নির্ধারণ করতে হলে ব্রিটিশ সরকারি নথি, সমসাময়িক বিবরণ এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক গবেষণা পাশাপাশি পাঠ করা প্রয়োজন।


জৈন্তিয়ার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যাওয়ার সেই মার্চের দিনটি তাই শুধু একটি রাজ্য দখলের ঘটনা নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।


(বাকি অংশ পড়ুন পরবর্তী পর্বে)


চিত্র: জৈন্তিয়ার রাজ-কার্যালয়ের দেয়াল ও ফটক

লেখক: আসিফ আযহার


১৮২৪-এর মৈত্রী থেকে ১৮৩৫-এর দখল—কীভাবে স্বাধীন জৈন্তিয়া ব্রিটিশ শাসনের অধীনে গেল


উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেও উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্য তখনো স্বাধীন ছিল। এর মধ্যে জৈন্তিয়া, আহোম, কাছাড় ও মণিপুর ছিল উল্লেখযোগ্য। এই অঞ্চলগুলো একদিকে ব্রিটিশ শক্তির বিস্তার এবং অন্যদিকে বার্মিজ সামরিক শক্তির উত্থানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক এলাকায় পরিণত হয়েছিল।


১৮১৯ সাল থেকে বার্মিজ বাহিনী উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যে মণিপুর, আহোম, কাছাড় ও আরাকানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরিস্থিতির এক পর্যায়ে বার্মিজ বাহিনী জৈন্তিয়া ও ব্রিটিশ-অধিকৃত সিলেটের দিকেও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।


এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের কাছে জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জৈন্তিয়া পাহাড় অতিক্রম করে আহোম অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ ব্রিটিশ বাহিনীকে বড় সুবিধা দিতে পারত। ফলে বার্মিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় ব্রিটিশরা জৈন্তিয়ার সঙ্গে মৈত্রীসম্পর্ক গড়ে তোলে।


১৮২৪ সালের ১০ মার্চ জৈন্তিয়ার রাজা রামসিংহ ও ব্রিটিশদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড ব্রিটিশ সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্মকর্তা ডেভিড স্কট জৈন্তিয়ার রাজার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আহোমের দিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। জৈন্তিয়ার সহযোগিতা ব্রিটিশ বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ ১৮২৬ সালের ইয়ানদাবু সন্ধির মাধ্যমে শেষ হলে বার্মিজদের উত্তর-পূর্ব ভারতের ওপর প্রভাব ভেঙে পড়ে। এরপর ব্রিটিশরা আহোম ও কাছাড়সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তবে তখনও জৈন্তিয়ার স্বাধীনতা বহাল রাখা হয়।


মৈত্রী থেকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব


জৈন্তিয়ার সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্কের এই পর্যায়টি ছিল পারস্পরিক প্রয়োজনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশদের প্রয়োজন ছিল জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড ও রাজার সহযোগিতা; আর জৈন্তিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।


কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।


জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে চুনাপাথরের খনি ও অন্যান্য সম্পদের কারণে অঞ্চলটি ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গবেষণামূলক ঐতিহাসিক বর্ণনায়ও জৈন্তিয়ার চুনাপাথরের খনিগুলোকে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


ব্রিটিশদের উচ্চপর্যায়ের নীতির সঙ্গে স্থানীয় কর্মকর্তাদের নীতির মধ্যে পার্থক্যও তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জৈন্তিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে সমঝোতা থাকলেও স্থানীয় ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে রাজ্যটির ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজতে থাকেন—এমন ব্যাখ্যা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।


রামসিংহের মৃত্যুর পর সুযোগ


১৮৩২ সালে রাজা রামসিংহের মৃত্যু হলে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সিংহাসনে বসেন রাজেন্দ্র সিংহ। তিনি ইন্দ্র সিংহ নামেও পরিচিত ছিলেন। নতুন রাজা ছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং পূর্বসূরির তুলনায় প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতায় দুর্বল।


এই সময় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জৈন্তিয়ার ওপর নতুন কিছু দাবি উত্থাপন করতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বার্ষিক ১০ হাজার টাকা কর বা খাজনা প্রদানের দাবি। কিন্তু জৈন্তিয়ার পূর্ববর্তী চুক্তির কাঠামোর সঙ্গে এই দাবির সামঞ্জস্য নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।


রাজেন্দ্র সিংহ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।


এরপর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ পুরোনো একটি ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসে—গোভায় কয়েকজন আহোম নাগরিককে হত্যা বা বলির অভিযোগ।


গোভার ঘটনা কী ছিল?


গোভা ছিল জৈন্তিয়ার অধীনস্থ একটি সামন্ত অঞ্চল। বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যের নগাঁও অঞ্চলের সঙ্গে এর অবস্থান সম্পর্কিত।


১৮৩২ সালের দিকে গোভায় কয়েকজন আহোম নাগরিককে আটক করে হত্যার ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় জৈন্তিয়ার রাজার কাছে প্রতিকার দাবি করে।


তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঘটনাটি জৈন্তিয়ার রাজধানীতে সংঘটিত হয়নি এবং রাজা রামসিংহের শাসনামলের শেষ দিকে এটি ঘটে। পরবর্তীতে রাজেন্দ্র সিংহ সিংহাসনে বসেন।


ঐতিহাসিক সূত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা অনুযায়ী, রাজেন্দ্র সিংহ শেষ পর্যন্ত ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজনকে ব্রিটিশ রাজনৈতিক কর্মকর্তার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। একটি গবেষণামূলক সূত্রে বলা হয়েছে, ১৮৩৪ সালের আগস্টে রাজা চারজন অভিযুক্তকে ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তর করেন।


এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহুল প্রচলিত বর্ণনায় মনে হতে পারে, অভিযুক্তদের হস্তান্তরে রাজা অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং সেই কারণেই ব্রিটিশরা জৈন্তিয়া দখল করেছিল। কিন্তু কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, অভিযুক্তদের হস্তান্তরের ঘটনাও ঘটেছিল।


তাহলে দখলের কারণ কী?


এখানেই জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত।


একটি সরকারি ও প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় মানববলির অভিযোগকে ব্রিটিশ দখলের অন্যতম প্রধান অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আরও কিছু গবেষণামূলক বর্ণনায় বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের হস্তান্তরের পরও ব্রিটিশ-জৈন্তিয়া সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি; বরং পরবর্তী সময়ে কর, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ভূখণ্ড এবং ব্রিটিশ স্বার্থ নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে।


ভারতের ২০১১ সালের আদমশুমারি-সংক্রান্ত জৈন্তিয়া হিলসের জেলা হ্যান্ডবুকেও বলা হয়েছে, ১৮২৪ সালের চুক্তির দুই প্রধান স্বাক্ষরকারী—ডেভিড স্কট ও রাজা রামসিংহ—দুজনের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর পুরোনো ও নতুন নানা সমস্যা থেকে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ১৮৩৫ সালের মার্চে জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল ব্রিটিশরা দখল করে।


অর্থাৎ, গোভার ঘটনাটি ব্রিটিশদের হাতে একটি আইনি ও রাজনৈতিক অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়।


‘হিস্টরি অব আসাম’-এর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন


জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উৎস স্যার এডওয়ার্ড গেইটের A History of Assam। কিন্তু পরবর্তী কিছু লেখক ও গবেষকের মতে, গেইটের বর্ণনায় রাজেন্দ্র সিংহ কর্তৃক অভিযুক্তদের ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।


এ কারণেই জৈন্তিয়ার ইতিহাসের কিছু স্থানীয় গ্রন্থে ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের কোনো প্রতিকারই করা হয়নি।


অন্যদিকে সৈয়দ মুর্তাজা আলীসহ পরবর্তী ঐতিহাসিক আলোচনায় এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে যে, রাজা শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তদের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দিয়েছিলেন।


এখানে তাই ইতিহাসের দুটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি—ব্রিটিশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।


রাজেন্দ্র সিংহ কি সত্যিই নরবলির সঙ্গে জড়িত ছিলেন?


রাজেন্দ্র সিংহের বিরুদ্ধে নরবলি বা হত্যাকাণ্ডে ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়টিও বিতর্কিত।


সৈয়দ মুর্তাজা আলীর আলোচনায় রাজেন্দ্র সিংহকে একজন কোমলমতি, ধর্মপ্রাণ ও বৈষ্ণব রাজা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরবর্তী অনুসন্ধানেও তাঁর ব্যক্তিগতভাবে নরবলির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।


তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত চরিত্রমূল্যায়নকে সরাসরি প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে সমসাময়িক নথি ও প্রত্যক্ষ সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।


অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন


জৈন্তিয়ার পতনের পেছনে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে দায়ী করলে পুরো প্রেক্ষাপটটি ধরা পড়ে না।


জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল ছিল অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চুনাপাথর ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্রিটিশদের আগ্রহের কারণ ছিল। একই সঙ্গে জৈন্তিয়া ছিল ব্রিটিশ-অধিকৃত সিলেট এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত ভূখণ্ড।


ঐতিহাসিক গবেষণায় এমন তথ্যও পাওয়া যায় যে, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজস্ব ও রাজকোষের পরিমাণ নিরূপণ করেছিলেন। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজ্যের নগদ রাজস্ব বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং রাজকোষে প্রায় ২০ লাখ টাকা জমা ছিল বলে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন। এরপর রাজেন্দ্র সিংহের ওপর চাপ বাড়ানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়।


এই তথ্য জৈন্তিয়া দখলের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।


১৮৩৫: স্বাধীন জৈন্তিয়ার শেষ অধ্যায়


১৮৩৫ সালের মার্চে ব্রিটিশরা জৈন্তিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়।


ঐতিহাসিক সূত্রের অধিকাংশে ১৫ মার্চ ১৮৩৫ তারিখে ক্যাপ্টেন লিস্টারের নেতৃত্বে দুই কোম্পানি সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রি জৈন্তাপুরের রাজধানী দখল করে এবং জৈন্তিয়া পরগনা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করে বলে উল্লেখ রয়েছে।


সিলেট জেলা প্রশাসনের একটি সরকারি প্রকাশনায় অবশ্য ১৬ মার্চ ১৮৩৫ তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেদিন রাজেন্দ্র সিংহকে বন্দী করার কথা বলা হয়েছে।


অতএব, তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে এক দিনের পার্থক্য থাকলেও ১৮৩৫ সালের মার্চেই জৈন্তিয়া রাজ্যের সমতলাঞ্চল ব্রিটিশ কর্তৃত্বে চলে যায়—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ঐকমত্য রয়েছে।


ব্রিটিশরা জৈন্তাপুরের রাজধানী দখল করে। রাজেন্দ্র সিংহকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি সিলেটে অবস্থান করেন এবং তাঁকে মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে।


জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল সরাসরি ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলও শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ফলে কয়েক শতাব্দীর জৈন্তিয়া রাজ্যের স্বাধীন অস্তিত্বের অবসান ঘটে।


ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন


জৈন্তিয়ার পতনকে শুধু ‘নরবলি বন্ধের অভিযান’ হিসেবে দেখলে ঘটনাটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়ালে পড়ে যায়। আবার কেবল ‘সম্পদ লুটের পরিকল্পনা’ হিসেবে দেখালেও ব্রিটিশদের সরকারি যুক্তি, সীমান্ত রাজনীতি এবং তৎকালীন প্রশাসনিক বিরোধগুলো উপেক্ষিত হয়।


নথিপত্র থেকে যে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় তা হলো—১৮২৪ সালে জৈন্তিয়া ও ব্রিটিশদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল; প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় জৈন্তিয়ার ভূখণ্ড ব্রিটিশদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল; ১৮৩২ সালে রামসিংহের মৃত্যুর পর সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়; রাজেন্দ্র সিংহের আমলে কর ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়; গোভার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগকে ব্রিটিশরা সামনে আনে; এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৩৫ সালের মার্চে জৈন্তিয়ার সমতলাঞ্চল দখল করে নেয় ব্রিটিশরা।


সুতরাং জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাসে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘চুক্তিভঙ্গ’, ‘মানববলি’, ‘অর্থনৈতিক স্বার্থ’ ও ‘ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ’—প্রতিটি শব্দের পেছনে আলাদা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। কোনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নির্ধারণ করতে হলে ব্রিটিশ সরকারি নথি, সমসাময়িক বিবরণ এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক গবেষণা পাশাপাশি পাঠ করা প্রয়োজন।


জৈন্তিয়ার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যাওয়ার সেই মার্চের দিনটি তাই শুধু একটি রাজ্য দখলের ঘটনা নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।


(বাকি অংশ পড়ুন পরবর্তী পর্বে)


চিত্র: জৈন্তিয়ার রাজ-কার্যালয়ের দেয়াল ও ফটক

© চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
channeljaintanews24.com