যে ১৪ আমলে রিজিক বাড়ে, যা কল্পনাও করতে পারবেন না : কোরআন-হাদিসের আলোকে হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
রিজিক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তবে রিজিক অর্জনের জন্য মানুষের চেষ্টা, বৈধ উপায় অবলম্বন এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের প্রয়োজন রয়েছে। চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি কিংবা অন্য কোনো হালাল পেশার মাধ্যমে মানুষ রিজিকের উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করে। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি পৃথিবীকে মানুষের জন্য সুগম করেছেন; তাই মানুষকে এর পথে বিচরণ করে তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার করতে বলা হয়েছে। সূরা আল-মুলকের ১৫ নম্বর আয়াতে এ নির্দেশনা এসেছে।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে রিজিক বৃদ্ধির বিভিন্ন আমল নিয়ে আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী। তাঁর আলোচনায় রিজিকের প্রশস্ততার জন্য ১৪টি আমলের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
১. তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন
আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন, তাঁর নির্দেশ পালন, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর ওপর অটল আস্থা রাখাকে রিজিকের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা আত-তালাকের ২-৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারীর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
২. তাওবা ও ইস্তিগফার করা
বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সূরা নূহের ১০-১২ নম্বর আয়াতে নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে আহ্বান করেন এবং এর সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, বাগান ও নদী-নালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত ইস্তিগফার সম্পর্কিত একটি হাদিস আবু দাউদ ১৫১৮ ও ইবনে মাজা ৩৮১৯-এ এসেছে। তবে হাদিসটির সনদকে কিছু মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন। তাই ইস্তিগফারের ফজিলত কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও তাদের অধিকার আদায় করাকে রিজিক প্রশস্ত হওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু দীর্ঘ হওয়া পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। সহিহ বুখারি ৫৯৮৫-এ এ হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।
৪. নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠের গুরুত্বও আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে নিজের দোয়ার বড় অংশ দরুদের জন্য রাখার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর দুশ্চিন্তা দূর হওয়া ও গুনাহ ক্ষমার কথা বলেছেন।
হাদিসটি জামে তিরমিজি ২৪৫৭-এ বর্ণিত এবং ইমাম তিরমিজি এটিকে ‘হাসান’ বলেছেন।
৫. আল্লাহর পথে ব্যয় ও দান করা
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করাকে রিজিক ও বরকতের একটি মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা সাবার ৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষ তাঁর পথে যা ব্যয় করে, তিনি তার বিনিময় প্রদান করবেন এবং তিনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা।
অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা দান-সদকা বিফলে যায় না—এ বিশ্বাস একজন মুমিনের অন্তরে দানের মানসিকতা তৈরি করে।
৬. হজ ও উমরা করা
হজ ও উমরার মাধ্যমে গুনাহ মোচনের পাশাপাশি অভাব দূর হওয়ার বিষয়টি হাদিসে এসেছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) হজ ও উমরা পরপর করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং বলেছেন, এগুলো দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে।
হাদিসটি জামে তিরমিজি ৮১০-এ বর্ণিত এবং ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান সহিহ বলেছেন।
৭. দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি সদয় হওয়া
অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি সদাচরণ এবং তাদের সহযোগিতা করাও ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবি মুসআব ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির ২৮৯৬ নম্বর হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের সাহায্য ও রিজিক দুর্বলদের দোয়া ও কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৮. ইবাদতের জন্য সময় বের করা
দুনিয়াবি ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর ইবাদতের জন্য সময় বের করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করার সঙ্গে অন্তরের প্রাচুর্য ও অভাব দূর হওয়ার বিষয়টি এসেছে।
জামে তিরমিজি ২৪৬৬-এ হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান গরিব বলেছেন।
৯. আল্লাহর পথে হিজরত করা
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হিজরত করলেও পৃথিবীতে প্রশস্ততা ও সুযোগ লাভের কথা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আন-নিসার ১০০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয় ও প্রশস্ততা পাবে।
১০. আল্লাহর পথে জিহাদ
লেখায় আল্লাহর পথে জিহাদের কথাও রিজিকের একটি প্রসঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে ‘আমার রিজিক আমার বর্শার ছায়াতলে রাখা হয়েছে’ মর্মে একটি হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে। তবে এই বক্তব্যকে বর্তমান সময়ের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা হিসেবে নয়, সংশ্লিষ্ট হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বোঝা প্রয়োজন।
১১. আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়
আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাকে রিজিক ও নিয়ামত বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি তাদের নিয়ামত বাড়িয়ে দেবেন।
১২. বিয়ে করা
বিয়ের মাধ্যমে মানুষের জীবনে দায়িত্ব বাড়লেও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বৈধভাবে সংসার শুরু করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সূরা আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিতদের বিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।
১৩. অভাবের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা
অভাব ও সংকটের সময় মানুষের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে আল্লাহর কাছে দোয়া করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সূরা গাফিরের ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।’
এ কারণে রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে হালাল, পবিত্র ও বরকতময় রিজিক প্রার্থনা করা উচিত। পাশাপাশি হালাল উপার্জনের চেষ্টা ও বৈধ উপায় অবলম্বন করাও জরুরি।
১৪. গুনাহ ত্যাগ, দ্বীনের ওপর অটল থাকা ও নেক আমল করা
গুনাহ থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল থাকা এবং নেক কাজ করে যাওয়াকে রিজিকের বরকতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দুনিয়ার সম্পদ ও প্রাচুর্যকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য না বানিয়ে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সূরা আল-আ‘লার ১৬-১৭ নম্বর আয়াতে দুনিয়ার জীবনের পরিবর্তে আখিরাতকে উত্তম ও অধিক স্থায়ী বলা হয়েছে।
রিজিকের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জনই মূল বিষয়
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকীর আলোচনার মূল বক্তব্য হলো—রিজিকের জন্য মানুষের চেষ্টা থাকতে হবে, তবে সেই চেষ্টা হতে হবে হালাল পথে। তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, ইস্তিগফার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দান-সদকা, আল্লাহর শুকরিয়া, ইবাদত ও দোয়ার পাশাপাশি বৈধ পেশা ও পরিশ্রমকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষ দুনিয়ায় চিরস্থায়ী নয়। তাই শুধু সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে ছুটে না গিয়ে আখিরাতের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আল্লাহর দেওয়া রিজিকে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পরিশেষে তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ যেন সবাইকে হালাল রিজিক অর্জনের জন্য বৈধ উপায় অবলম্বন, নেক আমল ও আল্লাহর আনুগত্য করার তাওফিক দান করেন এবং সবার রিজিক ও উপার্জনে বরকত দান করেন। আমিন।
লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতীব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।