জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি
সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত জৈন্তেশ্বরী বাড়ি জৈন্তিয়া রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন। প্রাচীন জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজধানী জৈন্তাপুরের রাজকীয় স্থাপত্য ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে এর ধ্বংসাবশেষ। তবে বাড়িটির নির্মাতা কে, ঠিক কোন সময়ে এটি নির্মিত হয়েছিল এবং প্রথমে কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
ঐতিহাসিক স্যার এডওয়ার্ড গেইটের A History of Assam গ্রন্থে জৈন্তিয়ার রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ জৈন্তাপুরে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থে বলা হয়েছে, সেই প্রাসাদের প্রবেশপথে নির্মাণ-সংক্রান্ত একটি শিলালিপি ছিল। শিলালিপির তারিখ অস্পষ্ট হওয়ায় সেটিকে প্রথমে ১৬৩২ শক, অর্থাৎ ১৭১০ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের রাজাদের শাসনকাল বিবেচনায় গেইট নিজেই এই পাঠ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ১৬০২ শক, অর্থাৎ প্রায় ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
ফলে জৈন্তেশ্বরী বাড়ির নির্মাণকাল নিয়ে একটি সম্ভাব্য সময়সীমা পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট সাল নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে লক্ষ্মী নারায়ণের শাসনকালও প্রায় ১৬৭৮-১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যশোমাণিক কি জৈন্তেশ্বরী বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন?
জৈন্তেশ্বরী বাড়ি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে ধারণাটি সামনে আসে, তা হলো—জৈন্তিয়ার রাজা যশোমাণিক কোচবিহার থেকে জৈন্তেশ্বরী দেবীর মূর্তি নিয়ে এসে সেটি স্থাপনের জন্য এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন।
তবে ঐতিহাসিক সূত্র বিশ্লেষণ করলে এই দাবির পক্ষে সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায় না।
গেইট তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, একটি প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী জৈন্তিয়ার রাজা যশোমাণিক কোচবিহারে গিয়ে পশ্চিম কোচ রাজ্যের রাজা লক্ষ্মী নারায়ণের কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। কথিত আছে, তিনি সেখান থেকে জৈন্তেশ্বরী দেবীর একটি মূর্তি নিয়ে জৈন্তাপুরে ফেরেন এবং এরপর মূর্তিটির নিয়মিত পূজা শুরু হয়। গেইট আরও উল্লেখ করেন, ১৭০৮ সালে আহোমদের জৈন্তিয়া বিজয়ের সময়ও মূর্তিটি জৈন্তাপুরে ছিল।
কিন্তু গেইটের এই বক্তব্যে জৈন্তেশ্বরী মূর্তি আনার সঙ্গে জৈন্তেশ্বরী বাড়ি নির্মাণের কোনো সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ, যশোমাণিক মূর্তিটি এনেছিলেন—এমন ঐতিহ্যের উল্লেখ থাকলেও তিনি মূর্তিটি রাখার জন্য জৈন্তেশ্বরী বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন—এমন তথ্য গেইট দেননি।
তাহলে বাড়িটি কেন নির্মিত হয়েছিল?
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
জৈন্তেশ্বরী বাড়ি যে রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল, সে বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ইঙ্গিত রয়েছে। জৈন্তাপুর ছিল জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজধানী এবং সেখানে রাজপ্রাসাদ, প্রশাসনিক কাঠামো ও ধর্মীয় স্থাপনার সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।
একটি গবেষণামূলক বর্ণনায় জৈন্তাপুরের রাজপ্রাসাদকে উঁচু স্থানের ওপর নির্মিত এবং প্রাচীরবেষ্টিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বর্ণনায় পুরোনো রাজপ্রাসাদ, জৈন্তেশ্বরী মন্দির এবং রাজদরবারের পৃথক অবস্থানের কথাও পাওয়া যায়।
এ কারণে জৈন্তেশ্বরী বাড়িকে শুধু একটি মন্দির বা দেবীমূর্তি সংরক্ষণের স্থাপনা হিসেবে দেখার আগে জৈন্তাপুরের বৃহত্তর রাজকীয় স্থাপত্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
জৈন্তেশ্বরী মূর্তি ও বাড়ির সম্পর্ক কতটা নিশ্চিত?
গেইটের বর্ণনা অনুযায়ী, যশোমাণিকের সঙ্গে জৈন্তেশ্বরী মূর্তির সম্পর্কের একটি ঐতিহ্য ছিল এবং মূর্তিটি ১৭০৮ সাল পর্যন্ত জৈন্তাপুরে থাকার কথা জানা যায়।
কিন্তু মূর্তিটি ঠিক কোন স্থাপনায় ছিল, সে বিষয়ে গেইটের বর্ণনা স্পষ্ট নয়। ফলে জৈন্তেশ্বরী বাড়ির নামকরণের সঙ্গে মূর্তিটির সম্পর্ক থাকলেও বাড়িটির মূল নির্মাণ উদ্দেশ্যকে শুধু মূর্তি স্থাপন বলে নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জৈন্তাপুরের পুরোনো স্থাপত্য নিয়ে পাওয়া বর্ণনায় জৈন্তেশ্বরী মন্দিরকে পুরোনো রাজপ্রাসাদের দক্ষিণে অবস্থিত বলা হয়েছে এবং মন্দিরটি প্রাচীরবেষ্টিত ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, রাজপ্রাসাদ, জৈন্তেশ্বরী মন্দির এবং অন্যান্য প্রশাসনিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে জৈন্তাপুর ছিল একটি বিস্তৃত রাজকীয় কমপ্লেক্স। বর্তমান ধ্বংসাবশেষের কোন অংশ কোন সময়ে নির্মিত হয়েছে, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
লক্ষ্মী নারায়ণের নির্মাণের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গেইটের ইতিহাসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জৈন্তিয়ার রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ জৈন্তাপুরে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন এবং সেই প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ তখনও বিদ্যমান ছিল। প্রবেশপথের শিলালিপিতে নির্মাণের কথা উল্লেখ ছিল বলেও তিনি জানান।
তবে শিলালিপির তারিখ ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্পষ্ট হওয়ায় নির্মাণের নির্দিষ্ট সাল নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। একটি স্থানীয় ঐতিহাসিক সংকলনেও বলা হয়েছে, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে শিলালিপির তারিখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে—যার ফলে পাঠ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে জৈন্তাপুর অঞ্চলও ব্যাপকভাবে কেঁপে ওঠে। সমকালীন ভূতাত্ত্বিক নথিতে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের সময় জৈন্তাপুরে কম্পনের তথ্য পাওয়া যায়।
রাজকীয় স্থাপনা থেকে প্রত্ননিদর্শন
জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজধানী হিসেবে জৈন্তাপুরে রাজপরিবারের প্রশাসনিক ও রাজকীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পরবর্তী সময়ে রাজ্য বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা নানা প্রশাসনিক ও বিচারিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
জৈন্তিয়া রাজ্যের শেষ পর্যায় ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশদের অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
বর্তমানে জৈন্তেশ্বরী বাড়ি ও আশপাশের ধ্বংসাবশেষ জৈন্তিয়া রাজ্যের অতীত স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। প্রত্নস্থানের বিভিন্ন অংশ, পুরোনো প্রাচীর, প্রবেশপথ, কূপ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্বও নথিভুক্ত হয়েছে।
তাহলে তিনটি প্রশ্নের উত্তর কী?
জৈন্তেশ্বরী বাড়িটি কে নির্মাণ করেছিলেন?
নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে যশোমাণিককে নির্মাতা বলা যায় না। স্যার এডওয়ার্ড গেইটের বর্ণনায় জৈন্তাপুরে একটি প্রাসাদ নির্মাণের সঙ্গে রাজা লক্ষ্মী নারায়ণের নাম সরাসরি যুক্ত রয়েছে। তবে বর্তমানের ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’ এবং গেইটের উল্লেখিত সেই প্রাসাদ একই স্থাপনার কোন অংশ—এটি আরও প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়।
কবে নির্মিত হয়েছিল?
নির্দিষ্ট সাল নিশ্চিত নয়। গেইট শিলালিপির একটি পাঠ ১৬৩২ শক/১৭১০ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে উল্লেখ করলেও তা নিয়ে আপত্তি তুলে ১৬০২ শক/প্রায় ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ হওয়ার সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। লক্ষ্মী নারায়ণের শাসনকালও এই সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কেন নির্মিত হয়েছিল?
এটিকে কেবল জৈন্তেশ্বরী দেবীর মূর্তি রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিল—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং জৈন্তাপুরের রাজকীয় রাজধানী, প্রাসাদ ও প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে এর ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। যশোমাণিকের সঙ্গে জৈন্তেশ্বরী মূর্তি আনার ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু সেই মূর্তি রাখার জন্য তিনিই এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন—এ দাবি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়।
ইতিহাসের যে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি
জৈন্তেশ্বরী বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এর ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং এর ইতিহাসের অনিশ্চয়তা। কে প্রথম নির্মাণ করেছিলেন, নির্মাণের কাজ কত বছর ধরে চলেছিল, স্থাপনাটির প্রাথমিক নকশা কেমন ছিল এবং জৈন্তেশ্বরী মূর্তির সঙ্গে এর প্রকৃত সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের অনেকটাই এখনো গবেষণার অপেক্ষায়।
তাই প্রচলিত লোককথা ও ঐতিহাসিক তথ্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি। যশোমাণিকের কোচবিহার যাত্রা ও জৈন্তেশ্বরী মূর্তি আনার ঐতিহ্য ইতিহাসের একটি অংশ; অন্যদিকে লক্ষ্মী নারায়ণের জৈন্তাপুরে প্রাসাদ নির্মাণের তথ্য একটি লিখিত ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। কিন্তু এই দুই তথ্যকে এক করে যশোমাণিককে জৈন্তেশ্বরী বাড়ির নির্মাতা হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
লেখক: আসিফ আযহার