ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ছাতকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা হাজী স্বপন মিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ বিক্ষোভকারীরা। তার প্রত্যাহারের দাবিতে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা ওসি মিজানুর রহমানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাজী স্বপন মিয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ছাতক শহরের তাহির প্লাজার সামনে আসেন। এ সময় স্থানীয় শতাধিক মানুষ তাকে অটোরিকশা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খবর পেয়ে ওসি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেয়।
পরে আহত অবস্থায় হাজী স্বপন মিয়াকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে স্থানীয় সূত্র ও একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এরপর হাজী স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না কিংবা বর্তমানে তার অবস্থান কোথায়—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা। তাদের দাবি, রোববার রাত থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে থানার ওসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তারা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাননি।
এদিকে, ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজী স্বপন মিয়াকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিলেটের উদ্দেশে নেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে পুলিশের সহযোগিতায় তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার দৃশ্য দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, হাজী স্বপন মিয়ার সঙ্গে ওসি মিজানুর রহমানের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলেও ওই নেতার বাসায় ওসির নিয়মিত যাতায়াত ছিল। এই সম্পর্কের কারণেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর হাজী স্বপনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তারা। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, হাজী স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সারপিননগর গ্রামের মৃত আব্দুল মতিনের ছেলে এবং বর্তমানে ছাতক পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মামলা-হামলায় হয়রানি, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল এবং চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতাকে হুমকি দেওয়া, সীমান্তে চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। এসব বিষয়ে থানার ওসিকে অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।
তবে হাজী স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের তাৎক্ষণিক কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে পুলিশ হেফাজত থেকে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা এ ঘটনায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এমন অভিযোগেরও সরকারি নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, একটি প্রতিবেদনে ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, হাজী স্বপন মিয়াকে স্থানীয় লোকজন মারধর করেছে বলে তারা জানতে পারেন। পরে তাকে প্রথমে ছাতক উপজেলা হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন স্থানীয়রা। পরে রইছ বোর্ডিং-সংলগ্ন প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা হাজী স্বপনকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত এবং ওসি মিজানুর রহমানের প্রত্যাহার দাবি করেন। এ সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
সমাবেশে ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জসিমউদ্দীন সুমেন, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সালমান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকি বিল্লাহ এবং উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক আব্দুল আলীম বক্তব্য দেন।
এ সময় ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তানিমুল ইসলাম তানিম, সাবেক পৌর ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুনেম মামনুন, পৌর যুবদলের সদস্য নোমান ইমদাদ কানন, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছাতক উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব আব্দুল বাকী মুহিত, বিএনপি নেতা জাহির উদ্দিন দিনান, গোলাম দস্তগীর জীবন, ঝুমন আহমেদ, সোনা আলী, সিফাত, তানভীর, ঈদরাকসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা পুলিশের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে আইন প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তাই ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান তারা।
অভিযোগের বিষয়ে ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে সোমবার রাতে থানায় গেলে তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। তার অফিসকক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা এবং হাজী স্বপন মিয়ার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।