Template: 2
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
লিংক channeljaintanews24.com ক্যাটাগরি ধর্ম রিপোর্ট চ্যানেল জৈন্তা নিউজ

পারিবারিক শান্তির জন্য রাসুল (সা.)-এর কিছু পরামর্শ

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ • ০৩:১৩ অপরাহ্ন

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী


নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা‘দ। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ছিল সারা জগতের জন্য রহমতস্বরূপ। ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ—সবার জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। বংশ-বর্ণ-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নবীজি (সা.)-এর আদর্শে রয়েছে সফল জীবনযাপনের দিকনির্দেশনা।


বৈবাহিক জীবনে সব দম্পতিই সুখী ও শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত নানা বিষয় অনেক সময় সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কখনো তা স্থায়ী পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়, আবার কখনো এর পরিণতি ঘটে বিচ্ছেদে। যার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর ওপরই পড়ে না; বরং দুটি পরিবার এবং তাঁদের সন্তান-সন্ততির ওপরও পড়ে।


নবীজি (সা.)-এর বিস্তৃত জীবনচরিতে পরিবার গঠন ও দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর দিকনির্দেশনা। এসব আদর্শ অনুসরণ করলে দাম্পত্য জীবনের অনেক কলহ-বিবাদ দূর করে একটি সুখী ও শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে তোলা সম্ভব।


পরিবারকে সময় দেওয়া


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, তিনি একদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উভয় জাহানের মুক্তির পথ জানতে চাইলে রাসুল (সা.) তাঁকে তিনটি উপদেশ দেন—কথাবার্তায় আত্মসংযমী হওয়া, পরিবারের সঙ্গে অবস্থান দীর্ঘ করা এবং নিজের ভুল-কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হওয়া। (তিরমিজি, হাদিস: ২৪০৬)


পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এ হাদিস থেকেই তা উপলব্ধি করা যায়। একটি আদর্শ পরিবার গঠনে পরিবারের সদস্যদের সময় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


তবে পরিবারের সঙ্গে সময় দেওয়া বলতে শুধু ঘরে শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকাকে বোঝায় না। একই ঘরে থেকেও যদি কেউ সারাক্ষণ টেলিভিশন, মোবাইল ফোন কিংবা ব্যক্তিগত কাজে নিমগ্ন থাকেন, তাহলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রকৃত অর্থে সময় কাটানো হয় না। বরং এতে সঙ্গীর মধ্যে একাকিত্ব ও অবহেলার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।


ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করা


স্ত্রীকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করাকে অনেকেই ভুলভাবে লজ্জার বিষয় মনে করেন। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের এর বিপরীত শিক্ষা দেয়।


হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবীজি (সা.) কি পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন? তিনি বলেন, “হ্যাঁ, নবীজি (সা.) পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। আর নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য বেরিয়ে যেতেন।” (বুখারি, হাদিস: ৬৭৬)


অন্যান্য বর্ণনায়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরোয়া কাজে সহযোগিতার বিষয়টি পাওয়া যায়। নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজে করে নেওয়া এবং পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা তাঁর জীবনের অন্যতম সুন্দর আদর্শ।


ব্যক্তিগত কাজে সঙ্গিনীর মতামত নেওয়া


চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়ে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরামর্শের সংস্কৃতি থাকে না। অথচ পারিবারিক জীবনে পারস্পরিক পরামর্শ ও মতামতের গুরুত্ব অনেক।


রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু পারিবারিক বিষয়েই নয়, মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাঁর স্ত্রীদের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় হজরত উম্মে সালমা (রা.)-এর পরামর্শ গ্রহণের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পরামর্শ অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। (বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)


এ থেকে বোঝা যায়, দাম্পত্য জীবনে একে অপরের মতামতকে সম্মান করা পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


সঙ্গিনীর প্রতি ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করা


অনেকেই মনে করেন, ভালোবাসা মনে থাকলেই যথেষ্ট; তা মুখে প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবে ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে ভালোবাসার কথা শোনা সম্পর্ককে আরও গভীর করে।


রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। হজরত খাদিজা (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “আমার মনে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া হয়েছে।” (মুসলিম, হাদিস: ২৪৩৫)


হজরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতিও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “সবার চেয়ে আয়েশা আমার কাছে এমন প্রিয়, যেমন সব খাবারের মধ্যে সারিদ আমার কাছে বেশি প্রিয়।” (বুখারি, হাদিস: ৩৪১১)


দাম্পত্য জীবনে তাই ভালোবাসা শুধু মনে ধারণ করাই নয়, যথাযথভাবে তা প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ।


সঙ্গিনীর জন্য নিজেকে পরিপাটি রাখা


আমরা সাধারণত সঙ্গীর কাছ থেকে সুন্দর ও পরিপাটি থাকার প্রত্যাশা করি। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। স্বামী যেমন স্ত্রীর কাছ থেকে পরিপাটি ও আকর্ষণীয় উপস্থিতি প্রত্যাশা করেন, তেমনি স্ত্রীরও স্বামীর কাছ থেকে একই প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক।


ইসলামী আদর্শে দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের জন্য সুন্দর ও পরিপাটি থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণে নিজের পরিচ্ছন্নতা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও ব্যক্তিত্বের প্রতি যত্নবান হওয়া দাম্পত্য সম্পর্ককে সুন্দর রাখতে সহায়ক হতে পারে।


দূরত্ব কমানো, আন্তরিকতা বাড়ানো


নবীজি (সা.)-এর পবিত্র জীবনে স্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও স্নেহের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এসব ঘটনা একটি আদর্শ দাম্পত্য জীবনের সুন্দর চিত্র তুলে ধরে।


হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় পূর্ণ। বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা, আনন্দ-বিনোদন এবং স্নেহের নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।


দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিকতা যত বাড়ে, পারস্পরিক দূরত্ব তত কমে। তাই সংসারে শুধু দায়িত্ব পালন নয়, একে অপরের অনুভূতি বোঝা, সময় দেওয়া, কথা বলা, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করাও জরুরি।


পারিবারিক শান্তির জন্য নবীজির আদর্শ


দাম্পত্য কলহের জেরে অসংখ্য পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে। কখনো সেই অশান্তি বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়, আবার কখনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। এর প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপরও।


অথচ পারিবারিক জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করলে অনেক সংকটই সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব। স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পরের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখেন এবং একে অপরের ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন, তাহলে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে তোলা অনেকটাই সহজ হয়।


আমরা যদি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শের এসব ছোট ছোট বিষয়ও নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করি, তাহলে তা পারিবারিক অশান্তির অন্ধকারে আলোর প্রদীপ হয়ে উঠতে পারে।


মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারে শান্তি, ভালোবাসা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।


লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।

সাবেক ইমাম ও খতীব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।

সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।

সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

বিজ্ঞাপন channeljaintanews24.com