Template: 1
Tpl 1 Tpl 2 Tpl 3
logo
channeljaintanews24.com
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৫ পূর্বাহ্ন
channeljaintanews24@gmail.com

পাঁচ খাল সাঁতরে স্কুলে যায় চরকারফারমার শিশুরা

চ্যানেল জৈন্তা নিউজ
🕒 শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৫ পূর্বাহ্ন

গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: ভোরের আলো ফুটতেই বই-খাতা বুকে নিয়ে স্কুলের পথে বের হয় শিশুরা। গন্তব্য বিদ্যালয় হলেও পথটি যেন প্রতিদিনের একেকটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। নেই কোনো পাকা রাস্তা, নেই সেতু, নেই নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে কখনো সাঁতরে, কখনো বুকসমান পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে একের পর এক খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাদের।


এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম চরকারফারমার শিশুরা। যোগাযোগব্যবস্থার এই দুর্ভোগে ভিজে যাচ্ছে বই-খাতা ও পোশাক। অনেকে আবার স্কুলে যাওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।


সরেজমিনে জানা যায়, গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ চরকারফারমা। পাঁচ নদীর মোহনা আগুনমুখার কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এ চরটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন ও বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে রামনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে আগুনমুখার মোহনা। চারদিক নদী ও মোহনায় ঘেরা হওয়ায় মূল ভূখণ্ড থেকে এলাকাটি অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।


প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। চরটিতে নেই কোনো পাকা সড়ক বা সেতু। বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে চলাচলের পথ ডুবে যায়। ফলে শিশুদের পাশাপাশি শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদেরও প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


স্থানীয়দের তথ্যমতে, চরকারফারমায় প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৫১ জন শিক্ষার্থী—২৬ জন ছাত্র ও ২৫ জন ছাত্রী—এবং তিনজন শিক্ষক রয়েছেন।


বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথের বর্ণনা দিতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, গলাচিপা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালিয়া স্লুইসগেট পর্যন্ত গাড়িতে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে আগুনমুখা নদীর তীরে পৌঁছাতে হয়। এরপর খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে চরকারফারমা ঘাটে পৌঁছালেও শেষ হয় না দুর্ভোগ। বিদ্যালয়ে যেতে আরও অন্তত পাঁচটি খাল পার হতে হয়।


বিকল্প কোনো নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে হয়। কখনো কোমর বা বুকসমান পানির মধ্য দিয়ে হেঁটেও খাল পার হতে হয়। এতে বই-খাতা ও স্কুলের পোশাক ভিজে যায়। অনেক শিশুকে অতিরিক্ত পোশাক সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। খাল পার হয়ে ভেজা কাপড় বদলে তারা শ্রেণিকক্ষে বসে পাঠ নেয়।


দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জহিরুল ইসলাম বলে, “আমরা কয়েকজন একসঙ্গে খাল সাঁতরে স্কুলে যাই। অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যায়। পরে ভেজা জামা বদলে ক্লাস করতে হয়।”


বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম বলেন, “এই চরে ৮০টি পরিবার বাস করে। আমি জায়গা দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু রাস্তা করার মতো সামর্থ্য আমার নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট করা দরকার।”


স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, “স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই—এ কথাটা সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। সামনে বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।”


বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও জানান, রাস্তাঘাট না থাকায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে।


উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, “বিষয়টি দুঃখজনক। রাস্তা না থাকার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। স্কুলের রাস্তা না থাকার বিষয়টি ইউএনও ও প্রতিমন্ত্রীকে জানিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। জায়গাটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। অন্য একটি প্রতিবেদনে তিনি আগামী বরাদ্দ থেকে স্কুলে যাওয়ার উপযোগী রাস্তা তৈরির আশ্বাস দিয়েছেন।


সরকারি উপজেলা ওয়েবসাইটেও চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি গলাচিপা সদর ইউনিয়নের বিদ্যালয় হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং সেখানে আনোয়ার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


স্থানীয়দের দাবি, দুর্গম চরটির শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি চলাচলযোগ্য রাস্তা ও প্রয়োজনীয় সেতু নির্মাণ করা জরুরি। তাদের মতে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না হলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হারও আরও বাড়তে পারে।

ছবি
channeljaintanews24.com
logo
ভিজিট করুন
২৯.০৮.২০২৬
© চ্যানেল জৈন্তা নিউজ — সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
channeljaintanews24.com